শিরোনাম
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি, ২০২০ ০২:৪৫

যশোর রোডের গাছ কাটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন: ভারতের শীর্ষ আদালত

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

যশোর রোডের গাছ কাটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন: ভারতের শীর্ষ আদালত

যশোর রোডের ভারতীয় অংশে শতাব্দী প্রাচীন কয়েক শতাধিক কেটে ফেলা গাছের পরিবর্ত হিসেবে কী করা যায় তা খতিয়ে দেখতে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

কমিটিতে রয়েছেন 'সেন্টার ফর সাইন্স এন্ড এনভায়রনমেন্ট' এর পরিবেশবিদ সুনিতা নারায়ন।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের পেট্রাপোল পর্যন্ত যশোর রোডের দুই ধারে তাবুর মতো বিছিয়ে থাকা ৩৫৬টি মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা সম্পর্কিত একটি মামলার শুনানিতে বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালত জানায় "যখন কোনো বহুমূল্যবান গাছ কাটা হয়, তখন অত বছর ধরে গাছটি যে অক্সিজেন সরবরাহ করে এসেছে, সেই ব্যাপারটি চিন্তা করুন।"
 
উল্লেখ্য, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হল যশোর রোড বা জাতীয় সড়ক-১১২। বারাসাত থেকে পেট্রাপোল পর্যন্ত ৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যশোর রোডের দুই ধারে মোট গাছের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার, যার অনেকগুলোই প্রায় ২ শতাধিক বছরের পুরোনো। কিন্তু এই সড়ক সম্প্রসারণ ও এর ওপর ওভার ব্রিজ বা উড়ালপুল তৈরির জন্য ২০১৭ সালের মার্চ-এপ্রিল নাগাদ এই রাস্তার দুই ধারে প্রায় ৩ শতাধিক গাছ নির্বিচারে কাটা পড়ে। এরপরই ওই গাছ কাটার প্রতিবাদ করে তার স্থগিতাদেশ চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করা হয়। যদিও এরপর কয়েক দফায় আদালতের তরফে এই মামলায় অন্তবর্তীকালীন স্থগিতাদেশও জারি করা হয়। অবশেষে গত ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে উন্নয়নের স্বার্থেই কলকাতা হাইকোর্ট ৩৫৬টি গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। সেক্ষেত্রে একটি শর্ত দিয়ে বলা হয়েছিল যে, একটি গাছ কাটার পরিবর্তে ওই অঞ্চলেই নতুন করে ওই প্রজাতিরই পাঁচটি চারা গাছ রোপণ করতে হবে। কিন্তু আদালতের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল বেসরকারি সমাসেবী সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফল প্রোটেকশন অব ডেমোক্রাটিক রাইটস (এপিডিআর)। 

বৃহস্পতিবার ওই মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি এস.এ.বোবদে এবং বিচারপতি বি.আর গাভি ও বিচারপতি সূর্য কান্ত'এর বেঞ্চ চার সদস্যের কমিটিকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। 

বেঞ্চ জানায় "এই বিষয়টি পরিবেশের অবক্ষয় এবং উন্নয়নের মধ্যে একটি দ্বিধা উপস্থাপন করছে ঠিকই তবে প্রতিটি পরিস্থিতি পৃথকভাবে বিবেচনাধীন।" 

আদালতে তরফে এও জানানো হয় "পরিবেশের ক্ষতির পুনর্মূল্যায়নের জন্য যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হোক না কেন, এই ঐতিহ্যবাহী গাছগুলো কেটে ফেলার পরিবর্ত হিসেবে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সেই পরামর্শ দেয়া বাঞ্ছনীয়।"

এদিন শুনানির প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে উদ্দেশ্য করে জানায় "আমরা যখন কোনো একটি ঐতিহ্যবাহী গাছ কাটি, তখন এতগুলো বছর ধরে ওই গাছটি যে অক্সিজেন সরবরাহ করে এসেছে, সে ব্যাপারটি চিন্তা করুন। সেক্ষেত্রে এই গাছগুলো যে অক্সিজেন দিয়েছে, সেই সমপরিমাণ অক্সিজেন যদি বাইরে থেকে নিতে হতো, তবে  তার জন্য আপনাকে কত খরচ করতে হতো, কল্পনা করুন।" 

নাগপুর-জব্বলপুর হাইওয়ে নির্মাণের জন্য যে ৪ হাজার গাছ কাটা হয়েছিল, এদিন সে বিষয়টিও উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি বোবদে। 

এই মামলায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হয়ে শীর্ষ আদালতের সওয়াল করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট অভিষেক মনু সিংভি। তিনি বলেন "সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্যই এ রেলওয়ে ওভার ব্রিজ (আরওবি) অত্যন্ত প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্যই এই ব্রিজ জরুরী। সমস্ত বিষয় দেখভালের জন্য কলকাতা হাইকোর্ট ইতিমধ্যেই একটি কমিটি গঠন করেছে।" 

অন্যদিকে 'অ্যাসোসিয়েশন ফল প্রোটেকশন অব ডেমোক্রাটিক রাইটস' (এপিডিআর) এর হয়ে এদিন প্রশ্ন করেন এডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ। তিনি বলেন "প্রায় ৮০ থেকে ১০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী গাছ কেটে ফেলার পরিবর্ত হিসেবে কোন পদক্ষেপ এখনো গ্রহণ করা হয়নি এবং তার জন্য কোনো অনুমতিও প্রদান করা হয়নি।" গাছ কেটে রেলওয়ে ওভার ব্রিজ তৈরির পরিবর্তে তিনি মাটির তলা দিয়ে সাবওয়ে তৈরির পরামর্শ দেন আদালতের কাছে। 

পরে দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে শীর্ষ আদালত বিশেষজ্ঞ কমিটিকে চার সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকেও ওই বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যদের যাতায়াত এবং থাকার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা করার কথাও বলেছেন শীর্ষ আদালত। 


বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ


আপনার মন্তব্য