সোমবার, ২১ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা

জরাজীর্ণ ভবনে শিক্ষার্থীদের বসবাস

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

জরাজীর্ণ ভবনে শিক্ষার্থীদের বসবাস

ছাদের পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। নোংরা, স্যাঁতসে্যঁতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নেই কোনো বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যেই ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে তিন থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে। এই চিত্র কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থীদের। পরিত্যক্ত, জরাজীর্ণ ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই শিক্ষাজীবন পার করছেন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এমন অবস্থা থেকে কবে শিক্ষার্থীদের মুক্তি মিলবে সংশ্লিষ্টদেরও এ ব্যাপারে কোনো কিছু জানা নেই। সূত্র জানায়, ২০১১ সালে পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু হয় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের। সর্বশেষ দশম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। ইতিমধ্যে শিক্ষা শেষে ৪টি ব্যাচ তাদের পড়াশোনার ইতি টেনে কর্মে যোগদান করেছেন। আরেকটি ব্যাচেরও শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় শেষের পথে। কিন্তু একের পর এক ব্যাচ শেষ হলেও কাক্সিক্ষত স্বপ্নের ক্যাম্পাস এবং হোস্টেলের দেখা মিলছে না শিক্ষার্থীদের। যে কারণে বছরের পর বছর অনেক আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা জরাজীর্ণ এসব ভবনেই শিক্ষা জীবন শেষ করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. দেলদার হোসেন জানান, বর্তমানে তাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৮৭ জন। হাসপাতালের চিকিৎসকদের কোয়ার্টার, নার্স, ম্যাটসের কোয়ার্টার সব মিলিয়ে ছাত্রদের ৫টি এবং ছাত্রীদের ২টি মোট ৭টি ছাত্রাবাস রয়েছে যেগুলোর সবই বসবাসের অযোগ্য। ২০১৪ সালে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়কের ঢাকা রোডে ছাত্র-ছাত্রীদের পৃথক দুটি হোস্টেলসহ কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। দুই বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৬ সালে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২০ সাল পর্যন্ত সর্ব শেষ সময় নেওয়া হয়। দফায় দফায় সময় বাড়ানোর পরও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিসহ দুর্নীতির কারণে বর্তমানে প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের শুরুতেই ছয়তলা ভবন বিশিষ্ট ছাত্রাবাস নির্মাণে পুরো প্যাকেজের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু ভবন নির্মাণ ব্যয় ছিল ৭  কোটি ৫৫ লাখ টাকা। কিন্তু ছয়তলা ভিত্তির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণেই চুক্তি হয় ৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকার। এ ছাড়া আরও ১ কোটি ১১ লাখ টাকার বর্ধিত অননুমোদিত ব্যয়  দেখানো হয়। একইভাবে ছয়তলা বিশিষ্ট ছাত্রী হল নির্মাণে বরাদ্দ ছিল ৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। যার অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। কিন্তু চারতলা ভবন নির্মাণেই চুক্তি হয় ৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকার। দুটি ভবনই ১০ হাজার ৫৪৫ বর্গফুট বিশিষ্ট। এ ছাড়া ক্যাম্পাস না থাকায় মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলছে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া  জেনারেল হাসপাতালের সামনে অবস্থিত ম্যাটসে। আর শিক্ষার্থীদের রাখা হয়েছে পাশেই প্রায় ৩০ বছর আগে চিকিৎসক, নার্সদের জন্য যে আবাসন ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল সেখানে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই ভবনগুলো অনেক আগেই বসবাসের অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। কোনো উপায় না থাকায় বাধ্য হয়েই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নোংরা-অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্যে শিক্ষার্থীদের এসব ভবনেই বসবাস করতে হচ্ছে। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের রিফাত ছাত্রী হোস্টেলের আবাসিক শিক্ষার্থী শাকিলাতুন মিষ্টি বলেন, একাডেমিক কার্যক্রমসহ ছাত্রী হোস্টেলে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে আমরা ৫টি বছর শেষ করলাম। অস্বাস্থ্যকর ঝুঁকিপূর্ণ হোস্টেলে নেই কোনো বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। খাওয়ার পানির জন্য নিচে নামতে হয়। ছাদের পলেস্তারা খসে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা আহত হন। দুর্ভোগ আমাদের নিত্য সঙ্গী। একটু দূরেই ছাত্রদের মিলন ছাত্রাবাস। সেখানকার তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোক্কারাবিন হক নিবিড় বলেন, দুর্ভোগের কোনো শেষ নেই। দুই দিন পর পরই পানির লাইনে আয়রন পড়ে জ্যাম হয়ে যায়। পানি পড়ে না। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। নোংরা পরিবেশ। নেই ভালো সৌচাগার। এক কথায় বসবাসের সম্পূর্ণ অযোগ্য স্থানেই আমাদের বসবাস। কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা যেসব ভবনে বসবাস করছেন তা অনেক আগেই ব্যবহার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা কীভাবে থাকে সেটা কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবেন। এর বেশি আমার জানা নেই। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হোস্টেল নির্মাণে এত সময়ক্ষেপণ হচ্ছে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা ছাত্রছাত্রীদের দুর্ভোগ ও কষ্টের বিষয়ে অবগত আছি।

ইতিমধ্যেই শতকরা ৯৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করে তিনি জানান, একনেকের সভায় এখনো সিদ্ধান্ত না আসায় প্রকল্পটি বর্তমানে ঝুলে রয়েছে। একনেকে অনুমোদন পাওয়া গেলেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাকি কাজ শেষ করে সংশ্লিল্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এদিকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।