লিওনেল মেসির সামনে জর্ডানের মানবপ্রাচীর। এর পেছনে গোলরক্ষক ইয়াজিদ। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের ফ্রি কিক। মানব প্রাচীরের পাশে সামান্য ফাঁক। সেখান দিয়ে বলটা বেঁকে গোলরক্ষকের ঠিক পাশ দিয়ে জাল স্পর্শ করল। অবিশ্বাস্য এই গোল দেখে সমর্থকরা আরও একবার বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন। গ্যালারির দর্শকদের সারিতে তখন সাবেক বড় বড় তারকা ফুটবলার। তাদেরও মাথায় হাত। হয়তো ভাবছিলেন, এমন গোলও কী সম্ভব! লিওনেল মেসির দৃষ্টিনন্দন এই গোলে জর্ডানকে ৩-১ ব্যবধানে পরাজিত করেছে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচ অপরাজিত থাকল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। গত বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের কাছে পরাজিত হওয়ার পর থেকেই আর পরাজয়ের মুখ দেখেনি আর্জেন্টিনা।
লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে রেকর্ড যেন নিত্যসঙ্গী। বয়স ৩৯ পেরিয়েছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, বিশ্বকাপে এবার হয়তো ‘মেসি-আলো’ আর আগের মতো ঝলমল করবে না। কিন্তু আর্জেন্টাইন মহাতারকা যেন সময়কেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। মাঠে নামলেই নতুন ইতিহাস লিখছেন। গোল করছেন। দলকে জেতাচ্ছেন। গড়ছেন নতুন নতুন রেকর্ড। আর নিজের কিংবদন্তিকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছেন।
জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পুরো ম্যাচ খেলেননি। কোচ লিওনেল স্কালোনি তাকে বিশ্রাম দিয়েছিলেন। এক ঘণ্টা বেঞ্চে বসে থাকার পর মাঠে নামেন। এরপর যা করলেন, তা যেন মেসির কাছ থেকে প্রত্যাশিতই। দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিকে গোল করে আর্জেন্টিনার ৩-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন। এবারের বিশ্বকাপে এটি তার ষষ্ঠ গোল। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসন আরও শক্ত করলেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটাও আরও উঁচুতে নিয়ে গেলেন (১৯ গোল)। ৫৬ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভাঙলেন মেসি। বিশ্বকাপে টানা ৭ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড নেই কারও। টানা ছয় ম্যাচে গোল করে এতদিন মেসি ছিলেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন ও ব্রাজিলের জোয়ারজিনহোর পাশে। ডি বক্সের বাইরে থেকে গোল করার তালিকায়ও এককভাবে ওপরে উঠলেন মেসি (৬ গোল)। ৫ গোল করে ব্রাজিলের রিভেলিনো নেমে গেলেন দুইয়ে। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার আটটি গোলের মধ্যে ছয়টিই এসেছে মেসির পা থেকে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন জোড়া গোল। আলজেরিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন হ্যাটট্রিক। আর জর্ডানের বিপক্ষে বেঞ্চ থেকে নেমে যোগ করলেন আরও একটি গোল। নকআউট পর্ব শুরুর আগেই বুঝিয়ে দিলেন, বয়স তার কাছে কেবল একটি সংখ্যা। মেসির দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে টানা তিন ম্যাচ জিতে পূর্ণ নয় পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘জে’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আর্জেন্টিনা। অস্ট্রিয়াকে ২-০, আলজেরিয়াকে ৩-০ এবং জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। জর্ডানের বিপক্ষে স্কালোনি প্রথম একাদশে বড় পরিবর্তন আনেন। নয়টি পরিবর্তন করে তিনি মূল দলের অনেককেই বিশ্রাম দেন। তবু আর্জেন্টিনার আধিপত্যে ভাটা পড়েনি। প্রথমার্ধে জিওভানি লো সেলসোর দারুণ এক ফ্রি-কিক থেকে এগিয়ে যায় দলটি। পরে ভিএআরের সহায়তায় পাওয়া পেনাল্টি থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন লটারো মার্টিনেজ।
দ্বিতীয়ার্ধে মুসা আল-তামারি একটি গোল শোধ করে জর্ডানকে কিছুটা আশা দেখান। ঠিক সেই সময় গ্যালারি একসুরে ডাকতে শুরু করে, ‘মেসি, মেসি।’ কয়েক মিনিট পর মাঠে নামেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। পুরো স্টেডিয়াম তখন যেন উৎসবের মঞ্চ। ম্যাচের শেষ দিকে পরিচিত ভঙ্গিতে বাঁকানো এক ফ্রি-কিকে বল জালে জড়িয়ে আবারও আলো কেড়ে নেন তিনি।