স্পেনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম, নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রবাসীদের সেবায় অবহেলার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর কেন্দ্রে রয়েছেন স্পেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমান, দূতাবাসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (হিসাব) ইসমত আরা বেগম এবং তার স্বামী জাফর ইকবাল।
এ ছাড়া গুরুতর আরও দুটি অভিযোগ হচ্ছে রাষ্ট্রদূতের মেয়ের নামে বাংলাদেশের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট তৈরি করা হয়েছে যা বর্তমানে স্পেনে বৈধ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত। বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে আসা নথিতে দেখা গেছে, রাষ্ট্রদূত কন্যা নিহন আনান রহমানের নামে ৩ জুন ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নেওয়া হয়। অথচ তার স্পেনের রেসিডেন্ট কার্ডে মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ দেওয়া আছে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৭ সাল। এদিকে রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী দিলমাত আরা মাসুদের পছন্দ না হওয়ায় দীর্ঘদিনের বাংলাদেশ হাউস ছেড়ে অন্যত্র অধিক খরচে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার অভিযোগও আছে বর্তমান রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে।
তথ্য ও নথি অনুযায়ী, দূতাবাসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী না হওয়া সত্ত্বেও দূতাবাস কর্মকর্তা ইসমাত আরার স্বামী জাফর ইকবাল দীর্ঘদিন ধরে দূতাবাসে প্রভাব বিস্তার করেন। পরে রাষ্ট্রদূতের নির্দেশে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর তাকে কনস্যুলার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিধি অনুসরণ না করেই সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই নিয়োগের সুপারিশে সেকেন্ড সেক্রেটারি মোহাম্মদ ইরফান চৌধুরী ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে লিখেছেন দুই বছর ধরে দূতাবাসের নানা কাজে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করার কারণে তাকে বর্তমানে শূন?্য কনস্যুলার এসিস্ট্যান্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হোক। মূলত রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমান ইসমাত আরা ও তার স্বামী জাফর ইকবালকে নিয়েই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানান। প্রবাসীদের কাছ থেকে নানা হয়রানি করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ আছে জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে।
এদিকে বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে আসা নথিতে দেখা গেছে, জাফর ইকবাল অফিশিয়াল পাসপোর্ট (ঊ০০১৫২৭৯১) যার মেয়াদ ৩১ মার্চ ২০২৮ সালে শেষ হবে সেটি রেখেও সাধারণ আরেকটি পাসপোর্ট (অ১৯০৭৫৬২১) গ্রহণ করেছেন ১৭ জুন ২০২৫ সালে। এই পাসপোর্ট নেওয়ার পেছনে স্পেনে বৈধ হওয়ার সুযোগ গ্রহণ করা বলে জানা গেছে তবে স্পেনের আইনে অফিশিয়াল পাসপোর্ট রেখে সাধারণ পাসপোর্ট দিয়ে বৈধ হওয়ার বিষয়টি নিয়মবহির্ভূত।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি (বিডিবিএল) থেকে দূতাবাসে চলতি বছরের ২ এপ্রিল পাঠানো এক ই-মেইল কপিতে দেখা গেছে, দূতাবাস কর্মকর্তা ইসমত আরা বেগম ও তার স্বামী জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে ২ কোটিরও বেশি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকের দাবি, বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন এবং অর্থ পুনরুদ্ধারের স্বার্থে দূতাবাসের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। উল্লেখ?্য, জাফর ইকবাল একই ব?্যাংকে প্রিন্সিপাল অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।
অন্যদিকে, চলতি বছর স্পেনে শুরু হওয়া বৈধকরণ কার্যক্রমে হাজার হাজার বাংলাদেশির পাসপোর্ট ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জরুরি প্রয়োজন থাকলেও দূতাবাস সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রবাসী নেতারা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পাঠানো ১৩৮ জন প্রবাসীর যৌথ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও অতিরিক্ত জনবল, বিশেষ টিম কিংবা দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ টিম পাঠানোর উদ্যোগেও দূতাবাসের অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত মাসুদুর রহমানের বক্তব্য জানা যায়নি। বাংলাদেশ প্রতিদিনের পক্ষ থেকে ৩০ জুন মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।