সারা দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে তেলেসমাতির ফলে যানবাহনচালকদের নাভিশ্বাস ওঠার পাশাপাশি যানবাহন চলাচলে একধরনের অস্থিরতা, স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে! রাতের বেলা লাইন দিয়ে পরদিন দুপুরে দশ-বারো লিটার তেল পাওয়া যাচ্ছে গাড়িচালকদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে! অথচ সরকারি ভাষ্যে বলা হচ্ছে, আগের মতোই স্বাভাবিক পরিমাণে পাম্পসমূহে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। আবার পাম্পমালিকদের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, আগের তুলনায় তারা বেশি পরিমাণ তেল বিক্রি করছেন। কিন্তু তারপরও পাম্পগুলোতে মাইলজুড়ে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে! এ অবস্থায় এখন জাজ্বল্যমান প্রশ্নটি হলো, সরকারের সরবরাহকৃত এবং পেট্রোলপাম্পের মালিকদের কথিত বিক্রয়কৃত এসব তেল যাচ্ছে কোথায়? কারণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ট্যাঙ্কে তেল তুলে, সেই তেল তারা বাসায় এনে মজুত করছেন বা অন্যত্র বিক্রি করে দিচ্ছেন এ কথাটিও সত্যি নয়! এ ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়া ফারসি ‘তেলেসমাতি’ শব্দটি এখানে উল্লেখযোগ্য! তেলেসমাতি মানে অদ্ভুত, বিস্ময়কর বা ঐন্দ্রজালিক কোনো ঘটনা। আর আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের বর্তমান সরবরাহ, বিক্রয় এবং ব্যবহারে তেমন ঐন্দ্রজালিক বা বিস্ময়কর কোনো ঘটনাই যে ঘটে চলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই! আর সে ক্ষেত্রে সরকার বা সরকারের কোনো সংস্থা সেই ইন্দ্রজাল, ভেলকি বা কৌশলের গূঢ় রহস্য ভেদ করতে পারছে না কেন সেটাও একটা প্রশ্ন? কারণ সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত তেলের সম্পূর্ণটা যে সড়কপথের যানবাহনে ব্যবহৃত হচ্ছে এই কথাটিও বিশ্বাসযোগ্য নয়! বিশেষ করে ঈদের পরে এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে যে ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশে যানবাহনের পূর্ণ তৎপরতাই শুরু হয়নি সে ক্ষেত্রে সরকারের বলা স্বাভাবিক সরবরাহের কথা বা পাম্পমালিকদের আগের তুলনায় বেশি বিক্রির কথা কিন্তু ধোপে টেকে না! সুতরাং এই দুই পক্ষের কথার মধ্যে কোনো ফারাক বা কৌশল আছে কি না, সে কথাটিও এখানে ভেবে দেখার মতো। আবার এই সুযোগে জ্বালানি তেল নিয়ে কেউ খেলা খেলছেন কি না বা মোটাদাগে বললে কোনো স্যাবোটাজ হচ্ছে কি না, সে বিষয়টিও সরকার গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে পারে!
উল্লেখ্য জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে আমাদের সরকারকে বিরাট অঙ্কের অর্থ ভর্তুকি প্রদান করতে হয়। আর এই ভর্তুকির অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে জোগান দিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হয়! অথচ রাস্তাঘাটে চলাচলের জন্য যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকার ভীষণভাবে উদাসীন! এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা বিআরটিএ অত্যন্ত উদারতার সঙ্গে সারা দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দিয়ে চলেছে! আর রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ সরকার শুধু কিছু পরিমাণ অর্থ পায় বলে এমন বেহিসেবিভাবে যানবাহন রেজিস্ট্রেশন প্রদানের কোনো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। কারণ এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের রাস্তাঘাটের পরিমাণ এবং ধারণক্ষমতা দেখে তারপর নতুন নতুন যানবাহন রাস্তায় নামানোর অনুমোদন দেওয়া উচিত। আর সরকারের হাতে এ বিষয়ে যে পরিসংখ্যান আছে তাতে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে আজ এই মুহূর্ত থেকে নতুন যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ না করা হলে দেশের মানুষের জন্য রাস্তাঘাটে চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। কারণ তেলের সংকট একসময় কাটিয়ে উঠলেও যানবাহনের যানজটে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়বে। তাই এখন থেকেই এ বিষয়ে সাবধান না হলে সরকারের পাশাপাশি সারা দেশের মানুষও যে বেকায়দায় পড়ে যাবে জনান্ততিকে সে কথাটিও এখানে বলে রাখা হলো! তা ছাড়া ফিটনেসবিহীন পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় মার্কা যানবাহন রাস্তায় নামানোর ক্ষেত্রেও সরকারি সংস্থা বিআরটিএ কঠোর ভূমিকা পালন করতে না পারলে অবস্থা বেগতিক হবে। কারণ এসব অতি পুরোনো ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় যেমন দুর্ঘটনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে, তেমনি এসব যানবাহনে অধিক পরিমাণ জ্বালানি তেলেরও প্রয়োজন হয়। সুতরাং কোনোমতেই ফিটনেসবিহীন পুরোনো যানবাহন রাস্তায় চলাচল করতে দেওয়া উচিত নয়। আর এসব ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থা বিআরটিএ যদি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ায়, কোনো পরিবহন মালিক সমিতি, শ্রমিকসংগঠনের কাছে মাথা নত না করে কেবল তখনই এসব অবৈধ যানবাহন রাস্তা হতে দূর করা সম্ভব হবে। অন্যথায় আগের মতো বিআরটিএর চেয়ারম্যানের পদসহ অন্যান্য পদপদবি যদি নিলামে তুলে সেসব পদে পোস্টিং দেওয়া হয় এবং সেসব চেয়ারে বসে ঘুষ বাণিজ্য করা হয়। তাহলে কোনো দিনও দেশের রাস্তাঘাটে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। কথাটি এখানে বলে রাখার কারণ হলো, সারা দেশের রাস্তাঘাট, হাইওয়েতে শৃঙ্খলা ফিরে এলে শুধু এই কারণেই কিন্তু প্রায় ২০ ভাগ জ্বালানি তেলের সাশ্রয় হবে। কারণ রাস্তায় অনিয়ম, বিশৃঙ্খলার কারণে, যেনতেনভাবে যেখানে সেখানে এলোপাতাড়ি পার্কিং, মাঝ রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা ইত্যাদি কারণেও প্রচুর জ্বালানি তেল অকারণে পুড়ে নষ্ট হয়। সুতরাং বিআরটিএ নামক সংস্থাটিকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর যে কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়েও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করি। পরিশেষে দেশের জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় আরও দুই-একটি কথা বলেই আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই।
আমি একজন ভ্রমণপিপাসু। বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশ ভ্রমণে বিভিন্ন দেশের রাস্তাঘাটের গতিপ্রকৃতি দেখে আমার এ বিষয়ে খানিকটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। আর সে দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথমেই যা বলব, আমাদের দেশের রাজধানী শহর স্থানান্তর করা অত্যন্ত জরুরি হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। স্থানাভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত না বলে শুধু এটুকুই বলব যে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর বেশ ফাঁকা থাকা অবস্থাতেই এবং সেখানে তেমন কোনো যানজট না থাকা সত্ত্বেও দেশটির রাজধানী খানিকটা দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যত চিন্তা করে মালয়েশিয়া সরকার ১৯৯৯ সালে রাজধানী শহরকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে পুত্রজায়ায় স্থানান্তরিত করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সৃষ্টির পর সে দেশটি দুইবার রাজধানী স্থানান্তরিত করে বর্তমানে ইসলামাবাদে একটি দৃষ্টিনন্দন রাজধানী শহর গড়ে তুলেছে, যা এখন পৃথিবীর মানুষের জন্য একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত আমরা ঢাকার মধ্যেই ঢাকা পড়ে রইলাম! এখান থেকে আমাদের নড়নচড়নের চিন্তাভাবনা আছে বলে মনে হয় না! কারণ এখানে এই চাপাচাপি ঠাসাঠাসির মধ্যেই আমরা চাপাবাজি করি, মারামারি, হানাহানি করি! একদিকে যানজট অন্যদিকে মানবজটে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে, পৃথিবীর সেরা দূষণের নগরীতে বসবাসের কারণে আমাদের হৃৎপিণ্ডে, ফুসফুসে আলকাতরার মতো কালো দূষিত পদার্থ জমে যায়, তবু আমরা রাজধানী স্থানান্তর করতে চাই না! কারণ এখানে থেকে, এখানে বসে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করা, হানাহানি করা, লগি-বৈঠা নিয়ে মারামারি করা, রাস্তা দখল করে মিটিং, মিছিল করা ইত্যাদি ঘটনা আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে গিয়েছে! সুতরাং এ ক্ষেত্রে কেউ কিছু করবেন বলে মনে হয় না! তবে এই রাজধানী শহর ঢাকা থেকে স্থানান্তর করলে শুধু এ কারণেই যে আরও ১০ ভাগ জ্বালানি তেলের সাশ্রয় হতো সে কথাটিও সত্য! যাক সে কথা। জ্বালানি তেল নিয়ে সবশেষে আরও কিছু বলেই আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই। অতীতে বেশ কয়েকটি দিন আমি চীনের বৃহত্তম নগর সাংহাইয়ে অবস্থানের কারণে সেখানকার যানবাহনসংক্রান্ত যে তথ্য পেয়েছিলাম তা হলো পৃথিবীর অন্যান্য শহরের তুলনায় সাংহাই শহরে যানবাহনের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অথচ সেখানে তেমন কোনো যানজট না দেখে অবাক হওয়ায় পরে জেনেছিলাম, নিবন্ধিত যানবাহনকে সাংহাই শহরে একদিন জোড় সংখ্যার এবং অন্যদিন বেজোড় সংখ্যার নাম্বারপ্লেটবিশিষ্ট গাড়িকে রাস্তায় নামতে দেওয়া হয়। ফলে সেখানে অসহনীয় যানজট সৃষ্টি হয় না। এ অবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে বলতে চাই, সাংহাইয়ের উদাহরণটি ঢাকায় বাস্তবায়ন করা যায় কি না, সে বিষয়টিও একটু ভেবে দেখতে পারেন। আর তা যদি সম্ভব হয়, তাহলে আগামীকাল থেকেই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করলে দেখতে পাবেন, নিমেষেই বর্তমান জ্বালানি তেল সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে! হ্যাঁ, জ্বালানি তেলের বর্তমান তেলেসমাতির ক্ষেত্রে এটিও কিন্তু একটি সমাধান হতে পারে!
♦ লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট