মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যাটো জোটের প্রতি বিরাগভাজন মনোভাব নতুন কিছু নয়। ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা খাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর পর্যাপ্ত ব্যয় না করার প্রশ্নে একাধিকবার সরব হয়েছেন তিনি। তবে সম্প্রতি ইরানের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই উত্তর আটলান্টিক জোটের চিড় ধরা সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ন্যাটোর অনেক মিত্র দেশ ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর নীতিকে সমর্থন না করায় ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে এখন প্রকাশ্য বিরোধ চলছে।
ইরান যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন না দেওয়াকে ট্রাম্প জোটের গায়ে এক অমোচনীয় কলঙ্ক হিসেবে অভিহিত করেছেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎসের উত্তরসূরি ফ্রিডরিখ মার্জ এই সংঘাতকে আটলান্টিক সম্পর্কের জন্য একটি চরম পরীক্ষা বলে বর্ণনা করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা যদি শেষ পর্যন্ত ন্যাটোর সংহতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তবে দশকের পর দশক টিকে থাকা এই সামরিক জোটের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে ন্যাটো যে ধরনের অভ্যন্তরীণ ভাঙনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তা এর আগে কখনো দেখা যায়নি বলে মনে করছেন জিম টাউনসেন্ডের মতো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
আইনগতভাবে ট্রাম্পের পক্ষে একক সিদ্ধান্তে ন্যাটোর সদস্যপদ ত্যাগ করা বেশ জটিল। মার্কিন সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন বা কংগ্রেসের বিশেষ আইন ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষে ন্যাটো থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যেহেতু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলেই ন্যাটোর প্রতি জোরালো সমর্থন রয়েছে, তাই অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকার জোট ত্যাগের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে জোট না ছাড়লেও ট্রাম্প অন্য উপায়ে ন্যাটোর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারেন যা জোটের কার্যকারিতা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।
উত্তর আটলান্টিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলোর এগিয়ে আসার কথা থাকলেও, সেখানে সামরিক সহায়তার বিষয়টি বাধ্যতামূলক নয়। ফলে ট্রাম্প যদি ইউরোপকে সুরক্ষার কোনো নিশ্চয়তা না দেন, তবে মিত্রদের মধ্যে চরম অবিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে যেসব দেশ আমেরিকার কথা শোনেনি, সেখান থেকে মার্কিন ঘাঁটিগুলো সরিয়ে বন্ধুসুলভ দেশগুলোতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প। বর্তমানে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৮৪ হাজার মার্কিন সেনাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে ন্যাটোর সামরিক শক্তি কার্যত অকেজো হয়ে পড়বে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউরোপের দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন হয়েছে। কিন্তু তারপরও উন্নত গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট সক্ষমতা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির জন্য ইউরোপকে এখনো আমেরিকার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এখন এক বিশাল অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়ালেও আমেরিকার সামরিক ও রাজনৈতিক ছায়া ছাড়া তারা কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। অন্যদিকে আমেরিকার জন্যও ন্যাটোকে পুরোপুরি অস্বীকার করা কৌশলগতভাবে আত্মঘাতী হতে পারে। যদি উভয় পক্ষ নিজ নিজ স্বার্থ ও জেদ বজায় রাখে, তবে ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক সামরিক জোট অচিরেই তার জৌলুস হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি ব্যর্থ চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। -আলজাজিরা