শিরোনাম
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি, ২০২১ ১৬:৫১
প্রিন্ট করুন printer

তামাকের ভয়াবহতা রোধে আইন সংশোধনের বিকল্প নেই

অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক

তামাকের ভয়াবহতা রোধে আইন সংশোধনের বিকল্প নেই
অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক। ফাইল ছবি

তামাক যে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি হুমকি তা নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই। বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়—তামাকের ভয়াবহতা বোঝাতে এই একটি তথ্যই বোধহয় যথেষ্ট। এর বাইরে তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতি হয় বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি, ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উপাত্ত পাওয়া গেছে। তামাকের ব্যবহার হ্রাস করার মাধ্যমে এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যু ও আর্থিক ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। বর্তমান করোনা মহামারীর এই সময়ে তামাকের ব্যবহার হ্রাস আরও বেশি জরুরি। কারণ, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক ব্যবহার করোনায় আক্রান্ত ও জটিলতা তৈরির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

তাছাড়া তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতাও রয়েছে আমাদের। বাংলাদেশই সর্বপ্রথম ২০০৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল—এফসিটিসি’তে স্বাক্ষর করেছে। এর ওপর ভিত্তি করেই ২০০৫ সালে দেশে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে আরও শক্তিশালী করা হয়। এর সুফলও পেয়েছি আমরা। ২০০৯ ও ২০১৭ সালে পরিচালিত গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) থেকে পার্থক্যগুলো বোঝা যায়।

সেখানে দেখা যায়, ২০০৯ সালের চেয়ে বর্তমানে তামাকের ব্যবহার তুলনামূলক ভাবে ১৮.৫% হ্রাস পেয়েছে (রিলেটিভ রিডাকশন)। ধূমপানের ক্ষেত্রে ২২% তুলনামূলক হ্রাস এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহারে ২৪% কমেছে। অর্থাৎ, এই আট বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৫ লাখ কমেছে। 

এছাড়াও বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে পরোক্ষ ধূমপানের হার, যেমন: রেস্তোরাঁয় ৩০%, কর্মক্ষেত্রে ১৯%, হাসপাতালে ১১% এবং গণ-পরিবহনে প্রায় ১০% কমেছে। তামাকের ব্যবহার হ্রাসের এই হার আশাব্যঞ্জক হলেও, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুসারে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি এফসিটিসির সাথে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এখনো কিছু জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে। যার ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন বিলম্বিত হচ্ছে।

বিদ্যমান ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে একাধিক কক্ষবিশিষ্ট গণপরিবহন-ট্রেন, লঞ্চ এবং চার দেয়ালে আবদ্ধ নয় এমন রেস্তোরাঁয় ধূমপানের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে করোনা মহামারীর এই সময়ে এমন পাবলিক প্লেসগুলোতে পরোক্ষ ধূমপান জনসাধারণকে আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে। আবার বর্তমান আইনে দোকানে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়নি। এই সুযোগে দোকানগুলোতে বিড়ি-সিগারেটের প্যাকেট সাজিয়ে রেখে তা বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের কৌশলী বিজ্ঞাপন শিশু-কিশোরদের তামাকের প্রতি আসক্ত করে তুলছে।

বর্তমান আইনের আরেকটি বড়ো দুর্বলতা হলো এটায় বিড়ি-সিগারেটের সিঙ্গেল স্টিক বা খুচরা শলাকা এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক দ্রব্য খোলা বিক্রি নিষিদ্ধ নয়। এমনিতেই বাংলাদেশে তামাকদ্রব্য বিশ্বের অধিকাংশ দেশের চেয়ে সস্তা। এর ওপর খুচরা বিক্রি হওয়ার ফলে তামাকদ্রব্যের দাম বাড়ানো হলেও তা আদতে শিশু-কিশোর ও নিম্ন আয়ের লোকজনের কাছে সহজলভ্যই থেকে যাচ্ছে। এতে করে তামাকদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে ব্যবহার কমানোর যে বৈশ্বিক অনুশীলন রয়েছে তা এদেশে ব্যর্থ হচ্ছে। 

অন্যদিকে, এই আইনে কিশোর ও তরুণদের জন্য নতুন হুমকি ই-সিগারেটের মতো এমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কিছু বলা নেই। এই সুযোগে এসব আসক্তিকর পণ্য সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যার সহজ শিকার হচ্ছে উঠতি বয়সীরা। তাছাড়া আইন অনুসারে তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি নিষিদ্ধ না হওয়ায় তারা লোকদেখানো সমাজসেবার মাধ্যমে সহজেই নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ পায়। সেই সাথে সমাজসেবার আড়ালে নিজেদের ‘বিষ-বাণিজ্য’কে জোরদার করে।

বিশ্বজুড়ে তামাকদ্রব্যের স্বাস্থ্য ক্ষতির কথা তুলে ধরার জন্য মোড়কের ওপর সতর্কতামূলক চিত্র ও লেখা মুদ্রণ করা হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে তামাক দ্রব্যের মোড়কের ৯০ শতাংশ জুড়ে এসব সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা ছাপানো হয়। কিন্তু আমাদের দেশে মোড়কের ৫০ শতাংশ জুড়ে এমন সচিত্র সতর্কবাণী মুদ্রণ করা হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন! উপরন্তু দেশে তামাকদ্রব্যের মোড়কের আকার সুনির্দিষ্ট নয়। ফলে বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাক দ্রব্যের ক্ষুদ্র আকারের মোড়কে সচিত্র সতর্কবার্তা সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। সেজন্য মোড়কের আকার নির্ধারণ এবং সতর্কতামূলক চিত্রের আকার মোড়কের ৯০ শতাংশ জুড়ে মুদ্রণের বিধান করা অত্যন্ত জরুরি।

বিদ্যমান তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনটিকে সংশোধন করে এসব দুর্বলতা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এটা করা গেলে নিঃসন্দেহে দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার হবে এবং তামাকের ব্যবহার কমবে। বিশেষত নতুন করে কেউ যাতে তামাকে কেউ আসক্ত না হয়, সেদিকে জোর দিতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন করে তামাকে কেউ আসক্ত না হওয়ার পাশাপাশি প্রতি বছর ১৮ লক্ষ তামাকসেবীকে তামাক গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে পারলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করা সম্ভব।

লেখক: ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ও যুগ্ম-মহাসচিব, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি

বিডি প্রতিদিন/আবু জাফর


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর