শিরোনাম
প্রকাশ : ১০ জুন, ২০২১ ১০:১৩
আপডেট : ১০ জুন, ২০২১ ১১:২২
প্রিন্ট করুন printer

মাতৃগর্ভে মানব ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক বর্জ্যের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব

ড. মো. আওলাদ হোসেন

মাতৃগর্ভে মানব ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক বর্জ্যের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব
ড. মো. আওলাদ হোসেন
Google News

গত পঞ্চাশের দশকের দিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে, মায়ের গর্ভের ভ্রূণ সকল প্রকার প্রতিকূল পরিবেশমুক্ত থাকে। অর্থাৎ বাইরের পরিবেশ ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু চিকিৎসা ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের নিয়মিত গবেষণার ফলশ্রুতিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, দূষিত পরিবেশ, বর্ধনশীল ভ্রূণের বর্ধনকে খুব সহজেই ব্যাহত করতে পারে। ফলে এক বা একাধিক বংশানুক্রম পর্যন্ত প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম হতে পারে, বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম হতে পারে।

কারণ গর্ভবতী মা যেসব খাদ্য আহার বা পানীয় পান করেন তার সবকিছুই গর্ভের সন্তান পরোক্ষভাবে গ্রহণ করে থাকে। গর্ভবতী মায়ের রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত পুষ্টি থেকেই গর্ভের সন্তান পুষ্টি গ্রহণ করে। গর্ভবতী মা শ্বাস-প্রশ্বাসে যে বাতাস গ্রহণ করে সেই বাতাস যদি দূষিত হয়ে থাকে তবে সেই দূষণ রক্তের সাথে ভ্রূণেও চলে যায়। অর্থাৎ গর্ভবতী মা দূষিত পরিবেশে বসবাস করলে গর্ভের ভ্রূণও ঐ দূষণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পরিবেশের ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের যে অবাঞ্ছিত পরিবর্তন জীবের জীবনধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাকেই দূষণ বলে। ক্ষতিকর পদার্থ পরিবেশে যোগ করলে তাকে দূষণ বা পরিবেশ দূষণ বলে। পরিবেশ দূষণ বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। Pollution is the introduction of contaminants into the natural environment that cause adverse change. Pollution can take the form of chemical substances or energy, such as noise, heat, or light. Pollutants, the components of pollution, can be either foreign substances/energies or naturally occurring contaminants.

ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। প্রিয় এই শহরে আমরা প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে অবচেতন মনে অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গে ফেলে দিচ্ছি। প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রের অধিকাংশই প্লাস্টিকের তৈরি। পৃথিবীতে প্রতি বছর ৪৫ কোটি টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশে যোগ হচ্ছে। এসব অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্যের শতকরা ১০ ভাগ পুড়িয়ে ধ্বংস করা হলেও বাকি ৯০ শতাংশের বেশি বিশ্ব পরিবেশকে নানাভাবে বিপন্ন করে তুলেছে।

২০২১ সালের পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত একটি পোর্টালে বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন লিখেছেন-, ‘প্লাস্টিক হচ্ছে কৃত্রিমভাবে তৈরি পলিমার, যা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি বা প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে রাসায়নিক উপায়ে তৈরি করা হয়। পরিবেশে যোগ হওয়া অপচনশীল নানা রকম প্লাস্টিক বর্জ্যের সঙ্গে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এবং পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের মিথষ্ক্রিয়ার (Interaction) ফলে মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিকের কণা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ (বিসফেনল-এ, ফথেলেটস, বিসফেনোন, অর্গানোটিনস, পার- এবং পলি ফ্লোরোঅ্যালকাইল পদার্থ এবং ব্রোমিনেটেড ফেইম রিটারডেন্টস উল্লেখযোগ্য) নিঃসরিত হয়ে পরিবেশ দূষিত করে।

পরিবেশে অপচনশীল প্লাস্টিকজাতীয় দ্রব্য, উপজাত, কণিকা বা প্লাস্টিকের দ্রব্য নিঃসরিত অণুর সংযোজন যা মাটি, পানি, বায়ুমণ্ডল, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও মানব স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে,  পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলছে। এসব মাইক্রো ও ন্যানো কণা এবং নিঃসৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মানুষ ও অন্যান্য জীবের হরমোনাল সিস্টেম নষ্ট করে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

ফলে প্লাস্টিক দূষণ মানুষ ও অন্যান্য জীবের প্রজননক্ষমতা নষ্ট করে, ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়া ব্যাহত করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করে নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি করে। এছাড়া এসব প্লাস্টিক ন্যানো কণা এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মানুষ ও অন্যান্য জীবের কোষাভ্যন্তরে অবস্থিত ডিএনএ ও আরএনএ অণুর মধ্যে পরিবর্তন করে ক্যান্সার বা স্নায়ুতন্ত্র বিকল করতে পারে। এছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানোর ফলে অদৃশ্য মাইক্রো প্লাস্টিকের কণা ভয়ংকরভাবে বায়ুদূষণ ঘটায়, যা নিঃশ্বাস ও প্রশ্বাসের সঙ্গে আমাদের ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে‘।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করলে শুধুমাত্র নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো তা নয়, আমাদের মধ্যে বসবাসরত গর্ভবতী নারীদের গর্ভের সন্তানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী সন্তানও জন্ম নিতে পারে।

১৯৯০-এ ইরাকে উপসাগরীয় যুদ্ধকালীন আমেরিকা ও ইরাক উভয়েই রাসায়নিক অস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল। পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা গেছে, রেডিয়েশন ও রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় যুদ্ধকালীন সময়ে ইরাকে বসবাসকারী গর্ভবতী অনেক নারী প্রতিবন্ধী সন্তান প্রসব করেছিলেন।

১৯৬০-৬৬ সালে জাপান ও ইংল্যান্ডের মাদকসেবীরা ‘থালিডোমাইড’ নামক ঘুমের ঔষধের প্রতি আসক্ত ছিল। পরিসংখ্যানে জানা গেছে ঐ সময়ে উভয় দেশেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘Phocomelia’’ নামক প্রতিবন্ধী শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। বিজ্ঞানী Horton & Newburt গর্ভবতী ইঁদুরের উপর গবেষণা করে একই তথ্য পেয়েছেন।

জাপানের Nagoya University-তে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকালে Environmental Medicine Department এর গবেষণাগারে আমার গবেষণাকর্মে গর্ভবতী ইঁদুরের Embryo Development এর বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ডোজ এ X-Radiation বিচ্ছুরিত করার ফলে ঐ গর্ভবতী ইঁদুরগুলো প্রতিবন্ধী (Hydrocephalus) বাচ্চা প্রসব করেছিল। ইঁদুরের গর্ভের প্রতিবন্ধী বাচ্চাগুলোর বর্ধন প্রক্রিয়ার পর্যায়গুলো (Developmental Stages) গবেষণা করে এই উপসংহারে উপনীত হয়েছিলাম যে, বর্ধন প্রক্রিয়ার যে পর্যায়ে Radiation বিচ্ছুরিত করা হয়, সেসময়ে কোষ বিভাজন বন্ধ হয়ে যায়, ফলে বর্ধন প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়। পুনরায় কোষবিভাজন শুরু হলেও বর্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কারণে Neural Tube (মাতৃগর্ভে শিশু সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়) ক্ষতিগ্রস্ত হয়, Neural Tube এর ঐ স্থানের নির্দিষ্ট অঙ্গটি বর্ধনে ব্যাঘাত ঘটে, শিশুর অঙ্গহানি হয়, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়। প্রতিবন্ধী শিশুও জন্ম হতে পারে। 

আমাদের সমাজে আমরা প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক বা পলিথিনের পাত্রে রান্না করা গরম বা ঠাণ্ডা খাবার ও পানীয় গ্রহণ করছি। এমনও দেখা গেছে গরম চা বা কফি গ্রহণেও প্লাস্টিক পাত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সকল প্লাস্টিক পদার্থ থেকে নিঃসরিত রাসায়নিক মাইক্রো বা ন্যানো পদার্থগুলো খাবারের সাথে মিশে যায়, যা আমরা গ্রহণ করছি। এসব খাবার থেকে অস্বাস্থ্যকর রাসায়নিক মাইক্রো বা ন্যানো পদার্থ মিশ্রিত পুষ্টি উপাদানগুলো রক্তের সাথে মিশে। গর্ভবতী মায়ের গর্ভে ধারণ করা ভ্রূণও মায়ের শরীরে প্রবাহিত রক্ত থেকে, রক্তে মিশে থাকা প্লাস্টিক পদার্থ থেকে নিঃসরিত রাসায়নিক মাইক্রো বা ন্যানো পদার্থ মিশ্রিত পুষ্টি গ্রহণ করছে।

Teratology experts-গন বলেছেন, গর্ভবতী মা যদি মাদকাসক্ত হয়, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করে, রক্তশূন্যতা ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে, ভুল ঔষধ বা কেমিক্যাল সেবন করে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণ এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করে, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত  হয়, তবে মায়ের শরীর থেকে প্রবাহিত দূষিত রক্তের মাধ্যমেই গর্ভের বর্ধনশীল শিশুর প্রতিটি কোষ প্রতিকূল পরিবেশের সংস্পর্শে আসে, ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। একই প্রক্রিয়ায় গর্ভবতী মায়ের রক্ত থেকে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য নিঃসরিত রাসায়নিক মাইক্রো বা ন্যানো পদার্থগুলো ভ্রূণের বর্ধন প্রক্রিয়া ব্যাহত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাব্যতাকে এড়িয়ে চলতে প্লাস্টিকদূষণ থেকে দূরে থাকা খুবই জরুরি।

এজন্য প্রতিদিনের বাজারে এবং কেনাকাটায় আমরা পাতলা পলিথিনের পরিবর্তে বারবার ব্যবহারযোগ্য কাপড়, পাট কিংবা শক্ত প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করে, একবার ব্যবহার করা (one time use) পাতলা পলিথিনকে বিদায় জানাতে পারি। দুধ ও পানীয়জাত দ্রব্যকে প্লাস্টিক মোড়কে বাজারজাত করা বন্ধ করে কাঁচের বোতল ব্যবহার বাধ্যতামূলক প্রয়োজন। প্লাস্টিক পাত্রে গরম-ঠাণ্ডা সব রকম খাবার বা পানীয় গ্রহণ, প্লাস্টিকের গ্লাস/কাপে গরম চা-কফি গ্রহণ পরিহার করি।

সিটি করপোরেশনসমূহ প্রতিটি বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সময় উন্নত বিশ্বে প্রচলিত পদ্ধতিতে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করতে পারে। আলাদাভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিটি ঘর থেকে সংগ্রহ করতে পারলে তা পুনর্চক্রায়ণ (recycle use) করে নতুন পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। এসকল ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ, সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্লাস্টিকের দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করে পরিবেশকে প্লাস্টিক দূষনমুক্ত রাখতে হবে।

বিডি প্রতিদিন/আবু জাফর

এই বিভাগের আরও খবর