বৈশাখ মাস চলছে। স্বাভাবিক সময়ে বৈশাখ মাসটি হাওরাঞ্চলের (কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মনবাড়িয়া) বোরো উৎসবের মাস। বোরো ধান কাটার এ সময়টিতে হাওরের কৃষকরা আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে সারা বছরের খোরাক ঘরে তুলে। অথচ এ বছর হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সে উৎসব নেই। তাদের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি।
বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে হাওরের কৃষকদের আধা-পাকা ও পাকা ধান। যারা বড় কৃষক তারা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আর যারা ছোট কৃষক, তাদের সারা বছরের খোরাকের জোগান হবে না। ফলে মহা সংকটে পড়েছে হাওরাঞ্চলের লাখো মানুষ।
কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানিয়েছেন, ২ এপ্রিল পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ের তথ্যমতে জেলায় ১০ হাজার ৫০ হেক্টর বোরো ফসলের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়। তিনি আরও বলেন, বাস্তবে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির প্রকৃত পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
পাকা ধানের খেত পানির নিচে, কেটে আনা ধানও রোদ না থাকায় শুকানো যায়নি। অনেক ধান পচে গেছে, কোথাও আবার অঙ্কুর গজিয়েছে। এই দৃশ্যই এখন পুরো হাওরাঞ্চলজুড়ে। হাওরের নদী, খাল ও বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নামার সুযোগ নেই। ফলে সমগ্র ফসলের মাঠ এখন বর্ষার ন্যায় পানিতে টইটুম্বুর।
পানিতে তলিয়ে যাওয়া খেত থেকে যা ধান কাটা হয়েছে, তা খুবই সামান্য। তোলা ধানের অনেকটাই সময়মতো শুকাতে না পারায় নষ্ট হয়ে গেছে। ধানের দিকে তাকালেই কৃষকদের বুক কষ্টে ভরে ওঠে।
ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেছেন হাওরাঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাড়ে সাত হাজার টাকা করে অনুদান দেবে সরকার। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন আগামী তিন মাস নাগাদ কৃষকরা এই সহায়তা পাবে।
এর আগে, গত ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেছিলেন হাওর এলাকায় কিছু ফসল নষ্ট হলেও তা খুব বড় পরিমাণ নয়। তবে উনার বক্তব্য ও বাস্তবচিত্র এক নয় বলে জানিয়েছেন হাওরাঞ্চলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষজন।
সরকারের পক্ষ থেকে এই সহায়তা ছোট কৃষকদের স্বল্প মেয়াদে কিছুটা সাহায্য করবে। তবে যারা বড় কৃষক তাদের জন্য এ সহায়তা খুব একটা কাজে লাগবে না। একজন বড় কৃষক যিনি ১০ একর বোরো ধানের চাষ করেছিলেন তিনি গড়ে ধান পাওয়ার কথা ৬০০-৭০০ মণ। পানিতে ধান তলিয়ে যাওয়া ও অন্যান্যভাবে নষ্ট হওয়ার পর তিনি যদি এর অর্ধেক পরিমাণ ধানও ঘরে তুলতে পারেন, তবে তিনি গড়ে ৩০০ মণ ধান কম পাচ্ছেন। বর্তমান বাজার মূল্যে যার দাম প্রায় ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ লাখ টাকা। এখন তিনি যদি মাসে ৭ হাজার ৫০০ টাকা পান তবে তিন মাসে পাবেন মোট ২২,৫০০ টাকা। বড় কৃষকরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ও ব্যক্তিগতভাবে ধার নিয়ে ধান চাষ করে থাকেন। সরকারি সহায়তার ২২ হাজার ৫০০ টাকা তাদের জন্য অপ্রতুল। আবার সব কৃষক এ সহায়তা নেবেন কিংবা পাবেন কিনা সেটাও বড় প্রশ্ন।
এমতাবস্থায় করণীয় কি?
শুধুমাত্র সাময়িক অর্থ বা অন্যান্য সহায়তায় হাওরাঞ্চলের এ সংকট কাটবে না। দরকার দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই ব্যবস্থাপনা। এর জন্য প্রাথমিকভাবে হাওরের ভরাট হয়ে যাওয়া নদী-নালা, খাল ও বিলগুলোকে খনন করে পানি ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচিকে হাওরে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদে হাওরাঞ্চলের জেলাগুলোকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র হাওর মন্ত্রণালয় গঠন করা যেতে পারে। হাওরজেলা কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফাইয়াজ হাসান বাবু হাওর মন্ত্রণালয়ের ও হাওরকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ঘোষণা করার দাবি জানান ফেসবুকে এক পোষ্টের মাধ্যমে। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানও সম্প্রতি জাতীয় সংসদে হাওর মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
পরিশেষে হাওর অধ্যুষিত জেলাগুলোকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র হাওর মন্ত্রণালয় গঠন ও হাওরকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ঘোষণা করার জোর দাবি জানাই। আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের নীতি নির্ধারকগণ হাওরবাসীর এই দাবি পূরণ করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ রাখতে ভূমিকা রাখবেন।
লেখক : সাংবাদিক ও হাওর উন্নয়নকর্মী