Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৮ জুন, ২০১৬ ২৩:৩০
গফুর আমিনা ও মহেশের বাজেট
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
গফুর আমিনা ও মহেশের বাজেট

‘জাতীয় বাজেট’ ‘জাতীয়’ হবে তখনই যখন সবার আশা-আকাঙ্ক্ষার সালতামামিসহ ভবিষ্যৎ দিনাতিপাতের পথ পরিক্রমার পথ নক্সা সেখানে আঁকা থাকবে। অতি প্রান্তজন ষাটোর্ধ গফুর, তার মেয়ে আমিনা এবং তাদের প্রিয় প্রাণিসম্পদ ও সংসারের অন্যতম অর্থনৈতিক সহযোগী সদস্য মহেশের কথা জাতীয় বাজেটে কীভাবে এবং কতটা প্রতিফলিত হয়েছে  সেটা নিরিখের তথা দিকদর্শন যাচাইয়ের বিষয়টি খোদ গফুর আমিনা আর মহেশের কাছে যখন জানতে চাইলাম তখন তারা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের ‘কৃষকের বাজেটের’ এক মফস্বল মাহফিলে গফুর এই সেদিন যোগ দিয়েছিল আর দশজনের মতো, সে যা বলেছিল তা ছবিতে ও শব্দে ধারণ করা হয়েছিল। সে শুনেছে গফুর যা যা বলেছিল তা টিভিতে নাকি দেখানোও হয়েছিল (মহেশদের তো আর টিভি দেখার সুযোগ বিধাতা তাদের টিওআরএ রাখেননি) কিন্তু বাজেটে তার কিছু প্রতিফলন হয়তো হয়েছে হয়তো হয়নি। তবে শিল্প ও ব্যবসায়ীদের বড় কর্তাব্যক্তিদের মতো গফুর যদি বলতে পারত তাদের দাবি-দাওয়ার কত পার্সেন্ট প্রতিফলন হয়েছে কি হয়নি। গফুর আমিনারা তো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বারান্দায়ও ঢুকতে পারে না, আর সচিবালয়ে, যেখানে বাজেটের রান্নাবাড়া হয়? তার নিজের কৃষি মন্ত্রণালয়ে? তবে বাপরে বাপ, একসময় লেখাপড়া না জানলে টিপসহি দিলে চলত, এখন নিদেন একটা মোবাইল ব্যবহারেও মেশিনে টিপসহি দিতে হচ্ছে শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাইকেই।

বাজেট বানানোর রান্নাঘরে ঢুকার না পারলেও বাজেটে যা সাব্যস্ত হয় তা টের পেতে গফুর আমিনাদের সময় লাগে না। বিকালে বাজেটে ফোনে কথা বলার ওপর বাড়তি বিলের ‘প্রস্তাব’ পেশ হতে না হতেই সন্ধ্যা থেকে গফুর আমিনার মোবাইলে কথা বলার ওপর বাড়তি পয়সা কাটা শুরু হয়ে গেল। গফুর নিজে এটা জানা বোঝার আগেই তার পয়সা কাটা শুরু হয়ে গেল। এ পয়সা সরকারের খাজাঞ্চিখানায় কখন পৌঁছাবে, আদৌ পৌঁছায় কিনা তার কিছুই সে জানে না, কেউ তাকে হিসাবও দেয় না। তবে সবতেই কেনাবেচায় তার পকেটের পয়সা ঠিকই হাওয়া হয়। আমিনা তো আরও অবাক। মাসে মাত্র ৩০ টাকা ভরে তার মোবাইলে— ভাইটা মালয়েশিয়ার জঙ্গলে কাজ করে— বাজানের সঙ্গে কথা বলে একটু রাইতে— শুধু লাইন পাওয়ার জন্য মাসে মাত্র ৩০ টাকা ভরে— সেখানে শোনা যাচ্ছে সেই টাকাও কমে যাবানে। আমিনা কিছু বোঝে না।

মোটাতাজাকরণ ধরনের যে তেলেসমাতি চালু হয়েছে তাতে নিজের মানসম্মান নিয়ে বংশ গৌরব ও জাতপাত নিয়ে মহেশদের ইদানীং বেঁচে থাকা দায়। মহেশদের এক সময় সম্মান ও কদর ছিল চাষাবাদে সহায়তার জন্য। এখন হালচাষের কাজও করে দেয় মেশিন। মহেশদের এখন পালাপার্বণে কাকে কত দামে বিক্রিযোগ্য করা যাবে সে ধান্দায় থাকে সবাই। এ জন্য তাকে কত কিছু খেতে দেওয়া হয়, তাকে হাইব্রিড পণ্য বানানোর জন্য। হায় অবস্থা এখন এমন হয়েছে গফুর এক মণ ধানের যা দাম পায় তা দিয়ে এক কেজি গরুর গোশতও পাওয়া যায় না। এক মণ ধানের দাম ৪০০ টাকা আর এক কেজি গরুর গোশত দেশের খোদ রাজধানী শহরের নগরপিতা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ঠিক করে দিয়েছেন ৪২৫ টাকা (তিনি হাজির না থাকলে ৪৫০ টাকা)। গফুর চোখে শর্ষের ফুল দেখে চলেছে এ আষাঢ় মাসেও। ৪০০ টাকায় এক মণ ধান। উৎপাদনের খরচ ওঠে না— আর তার বিনিময় মূল্য মহেশের চৌদ্দ ছটাক (থুককু ৮৫০ গ্রাম) মাংস? মহেশ আর গফুরের মধ্যে এই দূরত্ব সৃষ্টির কারণ বা এর নিরসনের কোনো বয়ান জাতীয় বাজেটে আছে কিনা গফুর মহেশ দুজনই জানে না। মহেশদের তো কোনো সমিতি নেই। খোদ গফুরদেরও পক্ষে বলার মতো সহায়ক সমিতি বা সংসদ আছে কিনা কে বলবে?

গফুরের বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। সে তিন জমানার তিন পতাকা দেখেছে। ব্রিটিশ আমলের পড়ন্ত বেলায় সে শুনেছে সামনে সুদিন আসছে। তার সঙ্গে তার পাড়ার পঞ্চায়েত পয়সাওয়ালাদের আর কোনো ফারাক থাকবে না— বৈষম্য কমে যাবে কত কিছু। কিন্তু পাকিস্তান আমলে সে জানতে পারল বৈষম্য কমেনি বরং বাইশ পরিবার চুরানব্বই লাখ পরিবারের প্রতিপক্ষ বনে গেছে। এসবের থেকে ‘মুক্তির সংগ্রামে’ গফুর নিজেও অনেক কষ্ট ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু পরবর্তী পঁয়তাল্লিশ বছরে, এখন ঘরে ঘরে শিক্ষিত বেকার সন্তানের সমাহার বাড়ছে। তাদের চাকরির বয়স চলে গেছে বা যাচ্ছে, তাদের অনেকেই এখনো চাকরি বা কোনো কর্মে নিয়োজিত হতে পারেনি। কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে অনেক কিছু খুইয়ে। আর তাদের দেশের কাজ করতে আসছে বিদেশের মানুষ। চাকরি বাকরি কর্মসৃজনে এই যে আত্মঘাতী অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে এসব নিয়ে জাতীয় বাজেটে কোনো কর্মপরিকল্পনা আছে কিনা গফুর এখনো জানতে পারেনি।

আর আমিনা? সে শুনেছে ‘জেন্ডার বাজেট’ হচ্ছে— তাদের সার্বিক উন্নয়ন সাধনে অংশগ্রহণের জন্য। হিসাব রাখা হচ্ছে হিসাব কষা হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির জন্য কিন্তু ওগুলো ‘মন বোঝানোর জন্য’ না আসল কিছু। না না বেশ কিছু উন্নতি হয়েছে। আমিনা শুনেছে তার দেশকে বাহবা দিচ্ছে বাইরের দুনিয়া। বড় শহরে গিয়ে দেখেছে ইয়া বড় ব্যানারে সেসব সাফল্য গাথা লেখা রয়েছে। হ্যাঁ সাফল্য এসেছে অনেক অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু আরও অনেক কিছু হওয়ার বা করার বাকি আছে। চেষ্টা চলছে। বাজেটে তার বাপজান ও অন্যান্য প্রান্তজনদের সামাজিক নিরাপত্তা জাল বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু আসন্ন শিক্ষিতজনদের কর্মসৃজনের প্রয়াস প্রচেষ্টায় কোনো কিছুর ভিজিবিলিটি বার বার চশমা পাল্টিয়েও বাড়ছে না। গফুর জমি চাষ করে এক ফসলের জায়গায় দুই তিন ফসল উচ্চ ফলনশীল শস্যের সমাহার ঘটায় কিন্তু তার বিক্রয় মূল্য যেভাবে পড়তে শুরু করেছে ভবিষ্যতে চাষাবাদে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়ে কিনা, তার দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বাড়া ভাতে ছাই পড়ে কিনা আবার খাদ্যশস্য আমদানির পথে হাঁটতে হয় কিনা গফুর কানাই করিম শামসু সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে।

গফুরের কানে এসেছে আরও একটি কথা। কৃষকদের কর দিতে হবে। শুধু কৃষকরা কেন সবাইকে তো কর দিতে হয়, দেওয়া হচ্ছেও। পরোক্ষ কর তো সবাইকে দিতে হচ্ছে। আয়করের ক্ষেত্রে মহিলা, প্রতিবন্ধী, জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের মতো গ্রামে কৃষিকাজে নিয়োজিতদের জন্য বিশেষ একটা ছাড় এর পর কর দিতে হয়। দেওয়ার বিধান ছিল বা রয়েছে। সুতরাং কৃষককেও কর দিতে হবে। এ জন্য আলাদা করে আবার আলোচনার সূত্রপাত কেন হবে। হ্যাঁ গফুর এটা মনে করে অনেকে কৃষির মতো অন্য কিংবা কৃষিখাতের আওতাভুক্ত করে অন্যান্য আয়কে কৃষিখাতভুক্ত ধরে বাড়তি ছাড় পাওয়ার প্রয়াসে থাকেন। গফুরের স্বল্প ও সাদা জ্ঞানে এটা বোঝা হয়ে গেছে যে, আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে ফাঁকির পথ খোঁজে ধড়িবাজরা আর সেই ধড়িবাজদের ধরার নাম করে আইনকে করা হয় কঠিন। কিন্তু তাতে ধড়িবাজদের যতটা না নিয়ন্ত্রণে আনা যায় গফুরের মতো সাধারণ সাদা ও স্বচ্ছ মনের সুবোধদের ওপর পড়ে আইনের আঘাত। ধড়িবাজরা বরাবরই আঁতাতের আশ্রয়ে চলে যায় আর নিরীহ শান্ত সুবোধেরা পড়ে বিপাকে। গফুরের মনে এই প্রবোধ ও প্রত্যয় যে, ‘চোর তো চুরি করবেই কিন্তু গৃহস্থকে সজাগ থাকতে হবে’। এখানে গৃহস্থ যদি চোরের মাসতুতো ভাই হয় তাহলে সে সমাজে ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ শব্দ বিপর্যয়ের কবলে পড়ে ‘শিষ্টের দমন দুষ্টের পালন’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গফুর ও আমিনারা গ্রামে বাস করে। সেই গ্রামীণ সমাজে বেশ কিছু পরিবর্তন তাদের ভাবায় বৈকি। ডিজিটাল অগ্রগতিতে সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অনেক ইতিবাচক সাফল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মালামাল পরিবহন এবং মূল্য নির্ধারণ বিপণন ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি ও সফলতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধার অবৈধ ব্যবহারে উসকে দিয়ে সামাজিক ঐক্য, শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ভিন দেশি ও ভাষী উগ্র ও অসামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে পরিচিতি ও ব্যবহারকে সহজলভ্য করে তুলেছে। তাদের পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চায় নানা অনৈতিক পন্থা ও প্রবৃত্তি অনুসরণে আগ্রহী করে তুলছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে চরম অরাজকতা বিরাজ করছে। শিক্ষকের নিয়োগ ও তাদের জ্ঞানবত্তা গুণগত মান নিয়ে সদাসর্বদা বাণিজ্য, অনিয়ম ও দুর্নীতি সর্বব্যাপী হয়ে ওঠায় শিক্ষার মানে ধস নামছে। জিপিএ-৫ পেয়েও শিক্ষার্থীরা উচ্চ পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষায়ই কুপোকাত হচ্ছে। চাকরি-বাকরির পরীক্ষায় তারা সত্ভাবে টিকতেই পারছে না। শহরের গুটিকয়েক ভালো স্কুল ও ভালো শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করাদের কাছে আপামর প্রান্ত ও পল্লী থেকে ওঠে আসারা দাঁড়াতেই পারছে না। গফুর দিব্য দৃষ্টিতে দেখছে তার দেশ ও সমাজ এক ধরনের অস্বস্তিকর মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার কারণে। শিক্ষায় ভর্তুকি দিয়ে জনশিক্ষার হার হয়তো বাড়ছে কিন্তু গণশিক্ষা হচ্ছে না। এভাবে অন্তসারশূন্য শিক্ষায় শিক্ষিতরা দেশ ও সমাজের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে ‘সমস্যা’য় পরিণত হয় কিনা গফুর কাকে দেখতে বলবে?

প্রাণিসম্পদের জন্য বাজেট বক্তৃতার ১২৫ অনুচ্ছেদের শেষের একটি বাক্য ছাড়া কিছুই মেলেনি। মহেশের মনে অনেক ক্ষোভ ও দুঃখ। সুন্দরবনের প্রাণিসম্পদ ও জীব-বৈচিত্র্য আজ নানা কারণে বিবিধ আক্রমণের শিকার। তাদের সুরক্ষার উন্নয়ন সম্পর্কে এবং তাদের সাম্প্রতিক ক্ষতির শিকার হওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বাজেটে তেমন কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই দেখে সুন্দরবনের বাঘ, বানর, হরিণ ও কুমির (বাবাহকু) সমিতি বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। মহেশ এসব খবর রাখে না। তার রাখার কথাও নয়। মত্স্য ও পশুসম্পদ বিভাগের কাজ একত্রে থাকায় এবং মত্স্য চাষাবাদ ও ব্যবসায়ের সঙ্গে নগদ স্বার্থবাদিতার সম্পর্ক বেশি থাকায় মত্স্য সম্পদের দেখভাল প্রক্রিয়া পশুসম্পদের হিস্সায় ভাগ বসাচ্ছে। মহেশের মনে দুঃখ অনেক।   গফুর মাছ চাষের ব্যাপারে যতটা না আন্তরিক তার দেখাশোনার ব্যাপারে ততটা নয়।  

গফুর আমিনা আর মহেশের বাজেট বরাদ্দ কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতভুক্ত। সেখানে দেখা যাচ্ছে (সারণী ৫) ২০১১-১২ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১৬.৮৭ ভাগ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা ১৯.৬৩ ভাগে উন্নীত হলেও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৬.৩৮, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৬.৫২, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূল বাজেটে ১৩.৮৯, সংশোধিত বাজেটে ১৫.১১ ওঠানামা করে এবং এসবের বিপরীতে এবারের বরাদ্দ ১৩.৫৮ ধরা হয়েছে।   গফুর আমিনা আর মহেশরা এর কোনো কূলকিনারা পায় না।   

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow