শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৬ মে, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ মে, ২০১৭ ২৩:৪৪

রমজান নিয়ে কিছু কথা

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

রমজান নিয়ে কিছু কথা
Google News

পশ্চিম আকাশে কবে উঠবে রমজানের চাঁদ— এই ভাবনায় বিভোর খোদার প্রিয় বান্দারা। মাহে রমজান নিয়ে আমাদের এত আবেগ-আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও এ মাসের অর্জন নিয়ে বরাবরই আমাদে হতাশ হতে হয়। এর বাস্তব প্রমাণ হলো, মাহে রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনার পরপরই যখন শাওয়ালের চাঁদ ওঠে, সঙ্গে সঙ্গেই রোজার সংযম-সাধনার রশি ছিঁড়ে যায়।  অশ্লীলতা, খোদার নাফরমানি হয় এমন লাখো কাজ মহামারী হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মুসলমানের সমাজে। এর কারণ কী? কারণ একটাই। কোরআন আমাদের যেভাবে সিয়াম সাধনা করতে বলেছে, বিশ্ব মুসলমান সেভাবে সিয়াম সাধনা করতে পারছে না।  রোজার আমল ও শিক্ষা বাস্তব জীবনে তেমন একটা প্রভাব ফেলে না। এর অন্যতম কারণ হলো পরিকল্পনাহীন রমজান যাপন। দুনিয়ার জীবনে যে কোনো কাজের জন্য আমাদের পরিকল্পনা থাকে। অথচ ধর্মের কোনো বিষয়েই আমাদের কোনো পরিকল্পনা থাকে না। মাহে রমজানের ইবাদতের বসন্ত খ্যাত এ মাসটি নিয়েও অধিকাংশ মুসলমানের আলাদা কোনো পরিকল্পনা থাকে না। তাই অন্যান্য দিন মাসের মতোই রমজান আসে এবং চলে যায়। পার্থক্য শুধু অন্য সব মাসে দিনে খাওয়া-দাওয়া করি আর এ মাসে খাই রাতে। প্রিয় পাঠক, আসছে রমজান যেন আগের রমজানগুলোর মতো হেলায়-ফেলায় পরিকল্পনাহীন কেটে না যায় তাই ‘রমজান বিষয়ে প্রস্তুত হোন’। রসুল (সা.)-এর জীবনে দেখতে পাই, রজব থেকেই তিনি রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। শাবানের পনের তারিখ পার হয়ে যাওয়ার পর কোমর বেঁধে খোদার ইবাদতে মশগুল হয়ে যেতেন তিনি (সা.)। যেন রোজা আসার আগেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করে রোজার মাসে খোদাকে পাওয়ার সাধনায় ব্রত হতে পারেন। নবুওয়ত লাভের পর রসুল (সা.) মাহে রমজানকে যেমন সাধনার মাস হিসেবে গ্রহণ করতেন, তেমনি নবুয়তের আগেও এই রমজান মাসেই তিনি খোদাকে পাওয়ার সাধনা করতেন। এভাবেই একদিন হেরাগুহা আলোকিত করে নাজিল হলো ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক। পড়ো! তোমার প্রেমময় প্রভুর নামে। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ রমজানের ফজিলত ও ফায়দা পূর্ণ রূপে হাসিল করতে হলে এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে। এ রমজানে আমি কতটুকু অর্জন করতে চাই। কতটুকু ছেড়ে দিতে চাই। এখন যদি পরিকল্পনা করতে পারি, তবে সুন্দরতম রমজান যাপন আমাদের জন্য সহজ হবে। রমজানের পরিকল্পনায় সর্বপ্রথম যে ব্যবস্থাটি রাখা যায় তা হলো— বিগত জীবনের গুনাহগুলো মাফ করিয়ে নেওয়া। হাদিস শরিফে রসুল (সা.) বারবার বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির চেয়ে হতভাগ্য আর কে আছে, যে রমজান মাস পেল কিন্তু নিজের গোনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না।’ (মিশকাত শরিফ)। অন্য হাদিসে রসুল (সা.) বলে দিয়েছেন, ‘কীভাবে আমরা গোনাহ মাফ পেতে পারি। নবীজী বলেছেন, ‘মান সামা রামাদানা ইমানাও ওয়া ইহতিসাবান গুফিরালাহু মা তাকাদ্দিমা মিন যামবিকা। যে ব্যক্তি ইমান ও আত্মসচেতনতার সঙ্গে সিয়াব্রত পালন করবে, আল্লাহতায়ালা তার ওপর রাজি ও খুশি হয়ে তার জীবনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ (বুখারি)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘রমজানের রাতগুলোতে যে ব্যক্তি নামাজব্রতে দাঁড়িয়ে থাকবে আল্লাহতায়ালা তার জীবনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (বুখারি)। মাহে রমজানকে কোরআন শেখা ও শেখানোর মাস হিসেবে নিতে পারি। নিতে পারি কোরআন বোঝা ও বোঝানোর মাস হিসেবেও। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘খাইরুকুম মান তাআল্লামাল কুরআনা ওয়া আল্লামাহু। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান মানুষ সে, যে নিজে কোরআন শিখে এবং অন্যকেও শেখায়। মাহে রমজানে অনেক মসজিদ-মাদরাসা-সংস্থা ফ্রি কোরআন শেখা ও বোঝানোর কর্মসূচি নিয়ে থাকে। একটু খোঁজখবর নিয়ে কোরআন নাজিলের মাস রমজানে কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে আশা করা যায়, এবারের রমজান আপনার দুনিয়া আখেরাতের জন্য কল্যাণকর কিছু বয়ে আনবে। মাহে রমজানের দানের হাত প্রসারিত করতে হবে। বুখারি শরিফের এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রবাহিত বাতাস যেমন বিরতিহীন বইতে থাকে, রমজান এলে রসুল (সা.)ও অকাতরে দান-খয়রাত শুরু করে দিতেন।’ সমাজের দুস্থ, অসহায় মানুষের জন্য এ মাসে অকাতরে ব্যয়ের জন্য এখনই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলুন। ক্ষুধার্ত ও সমস্যাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারলে যে কোনো ইবাদতই খোদার দরবারে পৌঁছবে না— এ কথাটি স্মরণ রাখতে হবে। রমজান যাপন নিয়ে সামান্য কিছু কথা বলেছি।  এর বাইরে হাজারো বিষয় আছে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে আশা করা যায়, মাহে রমজান আপনার আমার জীবনে ক্ষমা মাগফিরাত বয়ে আনবে।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসিসরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com