শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ২২:২৩

নগরীয় কৃষক সংগঠন

মোশাররফ হোসেন মুসা

নগরীয় কৃষক সংগঠন

সম্প্রতি একটি প্রথম সারির পত্রিকা প্রথম পৃষ্ঠায় ‘রাজধানীতে কৃষক লীগের কী কাজ’ শিরোনামে একটি বড় রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টে বলা হয়, রাজধানীতে কোনো কৃষিজমি নেই, কৃষকও নেই, অথচ উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে থানা, ওয়ার্ডগুলোয় কৃষক লীগের মোট পদধারী নেতা আছেন ৭ হাজার ৯২০ জন। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, যেসব নেতা মূল দলে জায়গা পান না, তাদের সন্তুষ্ট রাখতে সহযোগী সংগঠনগুলোয় পদ দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও একাধিকবার রাজধানীতে কৃষক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, গ্রাম-গঞ্জে কৃষককে সংগঠিত করতে কৃষক লীগের জন্ম হয়েছে। ঢাকায় কেন্দ্রীয় কমিটি থাকবে। কিন্তু আবাসিক এলাকায়, বিশেষ করে ঢাকা শহর বা বিভাগীয় শহরে কৃষক লীগের শাখা থাকার কোনো যুক্তি নেই। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজধানীতে এ ধরনের সংগঠনের কোনো প্রয়োজন নেই। এটা ফায়দাভিত্তিক রাজনীতির ফল। বাংলাদেশের কৃষক সমিতি খুলনা জেলার সভাপতি নিতাই গাইন বলেন, রাজধানীতে যেখানে কৃষি বা কৃষক নেই, সেখানে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কৃষক সংগঠন থাকার কোনো দরকার নেই। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘তিনি নিজেও একসময় কৃষক সংগঠন করতেন। কৃষক সংগঠকরা শহরে বাস করতে পারেন, মধ্যবিত্তের অংশ হতে পারেন। কিন্তু কৃষক সংগঠন করতে হলে তাকে অবশ্যই গ্রামে যেতে হবে। ঢাকা শহরে বাস করে কৃষক সংগঠন হতে পারে না।’ (প্রথম আলো, ৫ অক্টোবর, ২০১৯)। তাদের কাছে শহর মানে কৃষিশূন্য এলাকা। তাদের ভাবনায় নেই কৃষিতে বিভিন্ন প্রযুক্তি আবিষ্কারের কারণে নগরীয় কৃষি এসে গেছে। সেজন্য দরকার নগরীয় কৃষি ভাবনা। একই কারণে নগরীয় কৃষির জন্য দরকার নগরীয় কৃষক লীগ, নগরীয় কৃষক দল, নগরীয় কৃষক সমিতি ইত্যাদি। উল্লেখ্য, বর্তমানে সরকারি বিধিমালা ও পাঠ্যপুস্তকে রয়েছে কৃষি মানে মাঠ-ঘাট ও খাল-বিলের বিষয়। আর শহরে থাকবে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী তথা অকৃষি পেশার লোকেরা। ব্রিটিশ শাসকদের দেওয়া নীতি এখনো মেনে চলা হচ্ছে। অথচ ব্রিটিশসহ উন্নত দেশগুলো এ নীতি বহু আগেই পরিত্যাগ করেছে। তাদের দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী নগরীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বসবাস করছে। বর্তমান স্থানীয় সরকার আইনে ইউনিয়ন পরিষদকে প্রামীণ ইউনিট ধরা হয়। সেখানে কৃষকের উন্নয়নে বিভিন্ন কমিটি রয়েছে। কৃষককে পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা (ব্লক সুপারভাইজার) রয়েছেন। কিন্তু পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সে নিয়ম নেই। নগরে বিভিন্ন শৌখিন ব্যক্তি ছাদকৃষি, বারান্দা কৃষি, আঙিনা কৃষি, ঝুলন্ত কৃষি ইত্যাদি আবাদ করে থাকেন। এর সঙ্গে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কোনো সম্পর্ক নেই। বলা হচ্ছে, ২০৪১ সালের মধ্যে সমগ্র দেশটি নগর হয়ে যাবে (যদিও ‘সিডিএলজি’ দীর্ঘদিন যাবৎ বলে আসছে ২০৫০ সালের মধ্যে সমগ্র জনগোষ্ঠী নগরীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বসবাস করবে)। তখন সব এলাকা কৃষিশূন্য হয়ে গেলে আমাদের খাদ্যশস্য আসবে কোত্থেকে? বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী নগরে বসবাস করায় তাদের অধিকাংশ কৃষির বাইরে রয়ে গেছে। দেশের অবশিষ্ট এলাকা যদি অনুরূপ নিয়মে নগরায়ণ হয়ে যায়, তাহলে সমগ্র দেশের জনগোষ্ঠী কৃষির বাইরে চলে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কৃষিবিদ নিতাই চন্দ্র রায়ের এক গবেষণায় জানা যায়, উত্তর আমেরিকায় ৮২ শতাংশ লোক নগরে বসবাস করছে। ইউরোপে এ সংখ্যা ৭৪ শতাংশ। বর্তমানে এশিয়া মহাদেশে ৫০ ও আফ্রিকায় ৪৩ শতাংশ লোক নগরে বাস করে। তার গবেষণায় আরও জানা যায়, বড় নগরগুলোয় বর্তমানে ৫ লাখের বেশি কৃষি খামার গড়ে উঠেছে। এসব খামারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ-মাংস, দুধ-ডিম, মুরগির বাচ্চা, মাছের পোনা ও টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উন্নতমানের চারা উৎপাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ নগরীয় কৃষি শুধু প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহই করবে না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কাজও করবে। সেইসঙ্গে আরও মনে রাখা দরকার, দেশে দ্রুত নগরায়ণের কারণে দীর্ঘদিনের গ্রামীণ সংস্কৃতি লোপ পাচ্ছে; তৎস্থলে নাগরিকরা গ্রামীণ-নগরীয় সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে। ফলে সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। সিডিএলজির মতে, যেসব নগর অপরিকল্পিত গড়ে উঠেছে সেগুলোকে পরিবেশবান্ধব করতে হবে এবং যেসব গ্রামীণ ইউনিট এখনো নগর হয়নি, সেসব এলাকাকে পরিকল্পিত নগরায়ণের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি দলীয় কর্মসূচিতে না নিলে জনগণ সঠিক নগরায়ণের কাজে সম্পৃক্ত হবে না। প্রতিবেদনটিতে প্রশ্ন করা হয়েছে, নগরে কৃষক লীগের কী কাজ? একই ভাবে প্রশ্ন করা যায়, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন কমিটি থাকার কী দরকার? কারণ ছাত্ররা তো থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এ রকম হাজার হাজার প্রশ্ন করার বহু গবেষক রয়েছেন। কিন্তু সমাধানের কথা খুব কম ব্যক্তির মুখেই শোনা যায়। অর্থাৎ উদ্ভূত সমস্যাটি শাসনগত ত্রুটির ফসল। এ দেশের  জমির স্বল্পতা ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় নিয়ে নগরায়ণের চিন্তা করতে হবে। আগামীর নগরীয় বাংলাদেশ সামনে নিয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বশাসিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও নয়া কর্মসূচি নিতে হবে। তখন নগরে ‘নগরীয় কৃষক লীগ’, ‘নগরীয় কৃষক দল’, ‘নগরীয় কৃষক পার্টি’, ‘নগরীয় কৃষক সমিতি’ ইত্যাদি নামে কৃষক সংগঠন থাকলে কেউ প্রশ্ন করার সুযোগ পাবে না।

লেখক : গণতন্ত্রায়ণ ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক।

ইমেইল : [email protected]


আপনার মন্তব্য