শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ মার্চ, ২০২০ ২৩:২৫

আমার ভাইরাস ডায়রি

তসলিমা নাসরিন

আমার ভাইরাস ডায়রি

মার্চ ৩

শেষ পর্যন্ত এসেই গেল করোনা। এ শহরে মৃত্যুর হার ২ পারসেন্ট হওয়ার কিন্তু কোনও কারণ নেই। চোখে দেখা যায় না এমন ছোট ভাইরাস, পুরো মানব প্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর আমরা আমাদের ধনদৌলত নিয়ে, আমাদের উঁচু উঁচু দালানকোঠা নিয়ে, আমাদের বড়ত্ব শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কী গর্বই না করি। পারমাণবিক বোমা,  অ্যাস্টরয়েড, কোনও ভাইরাস, কোনও বেয়াদপ ব্যাকটেরিয়াই যথেষ্ট আমাদের নির্মূল করতে। আমাদের আসলে কারোর পায়ের তলায় মাটি নেই। আমরা পতঙ্গের মতো হাওয়ায় ভাসছি। অনিশ্চয়তা আমাদের জীবনে কালো টাট্টুর মতো সেঁটে আছে। আমরা বেঁচে আছি এই মনগড়া গল্প নিয়ে যে আমাদের মরণ নেই, আমরা বারবার জন্ম নেবো, অথবা আমরা কবর থেকে একবার জেগে উঠে আর কখনও মরবো না। আমাদের মানব প্রজাতি এমন কোনও ভালো প্রজাতি নয়, ভায়োলেন্ট, সুপারস্টিশাস, সেল্ফিশ। এই প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে পৃথিবীর কিছু আসবে যাবে না।

মার্চ ১০

শুনছি করোনাভাইরাস বাচ্চাদের মারছে না, মারছে বয়স হয়েছে যাদের, তাদের, বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস আর হাই ব্লাডপ্রেসার আছে। আমার মতো রোগীদের পৃথিবী থেকে বিদেয় করে বাচ্চাদের বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্তটা খারাপ নেয়নি ভাইরাসবাবু। এখন কি ভয়ে কাঁপতে হবে আমার? অবশ্যই না। জীবনকে যতদিন পারি, যেভাবে পারি উপভোগ করবো। এর রূপ রস গন্ধ উপভোগ করবো। উপভোগ করা মানে কিন্তু মদ খেয়ে নাচানাচি নয়, অথবা শুয়ে বেড়ানো নয়। আমার কাছে উপভোগ করা মানে তো ভালো কোনও বই লেখা, ভালো কোনও বন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ গল্প করা অথবা ভালো একটি বই পড়া বা চমৎকার কোনও প্রকৃতি দেখা অথবা পোষা বেড়ালকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর করা। আরও কত রকমভাবে উপভোগ করা যায়, অন্যায় আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে গলা চড়িয়ে, মানুষের সমমর্মী হয়ে, পশুদের ভালোবেসে, সমাজের পরিবর্তন ঘটিয়ে- মোদ্দা কথা জীবনকে অর্থপূর্ণ করে। একদিন তো যেতেই হবে, ভাইরাসবাবু যদি ক্ষমা করে দেয় এবারের যাত্রা, সামনে কত রকমের ব্যাকটেরিয়া, ক্যান্সার, ফেইল্যুর, ক্রিয়া বন্ধ হওয়া ইত্যাদি অপেক্ষা করছে, সবাই তো আর ক্ষমা করবে না। তার আগ অবধি জীবনের পুজো করাই বুদ্ধিমতীর কাজ।

মার্চ ১১

মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস। সবচেয়ে ভয়ংকর, রোগের উপসর্গ না থাকলেও লোকেরা ভাইরাস আক্রান্ত হতে পারে এবং ভাইরাস ছড়াতে পারে। সুতরাং আশপাশে যাদেরকে সুস্থ বলে মনে করছি, তারা সুস্থ না হতেও পারে। দুনিয়াটা সেইসব পোস্ট এপোক্যালিপ্টিক সায়েন্স ফিকশনের মতো হয়ে যাচ্ছে কিনা কে জানে, যেখানে মানুষ মরে শেষ হয়ে যায়, শুধু কিছু বন্যপ্রাণী শহরময় ঘুরে বেড়ায়। অথবা অল্প কিছু মানুষ যারা বেঁচে থাকে, তারা মানুষের ভয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। ইতালির রাস্তাঘাট তো এখন তেমনই দেখতে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী সোফিকে ধরেছে এই ভাইরাস। এই ভাইরাস তো বিখ্যাত-অখ্যাত, ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। আমরা যারা এখন মনে করছি অন্যকে ধরবে ভাইরাস, আমাকে ধরবে না- হয়তো পরীক্ষা করালে ভাইরাস পাব শরীরে। এখন না পেলেও খুব শীঘ্র হয়তো পাব।

মার্চ ১৪

উহান থেকে বাংলাদেশিদের নিয়ে আসার কী দরকার ছিল? সবচেয়ে ভালো উহানে থাকা। কারণ বাংলাদেশের থেকে চীনের স্বাস্থ্যসেবা ভালো, ওখানকার কোয়ারেন্টাইনের সিস্টেম ভালো। এ কথা বলার পর, বাপরে বাপ, টুইটারে কী গালি যে খেতে হয়েছিল আমাকে। আমি কী বুঝি, আমার নাকি কোনও ফ্যামিলি নেই, ফিলিংস নেই ইত্যাদি ব্লা ব্লা ব্লা।

ইতালিতে ছড়িয়ে গেছে ভাইরাস। আর ভাইরাস রক্তে নিয়ে বাংলাদেশিরা ইতালি ছেড়ে চলে এসেছে ফ্যামিলি আর দেশের আবেগে। কী করবে এরা এখন? মা-বাবা, ভাইবোন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়াপড়শিকে সংক্রামিত করবে। ছড়িয়ে পড়বে ভাইরাস এক শহর থেকে আরেক শহরে। সরকার কী করবে? বসে বসে আঙ্গুল চুষবে, আর বিপদ দেখলে দেশ ছেড়ে পালাবে। কিন্তু পালাবেই বা কোন দেশে, সবখানেই তো ভাইরাস!

মার্চ ২০

এক জীবনে দুর্ভিক্ষ দেখেছি, যুদ্ধ দেখেছি, গণআন্দোলন দেখেছি, মিলিটারি ক্যু দেখেছি, শাসক-হত্যা দেখেছি, মুক্তচিন্তক-খুন দেখেছি, ধর্মীয় সন্ত্রাস দেখেছি। এক জীবনে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ ভাইরাসের আক্রমণে গণমৃত্যুও দেখা হলো। এর আগে এ শুধু বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতেই দেখেছিলাম।

জানি না ভাইরাসের কবল থেকে বাঁচতে পারবো কিনা। অসুস্থ মানুষের ধারে কাছে যাচ্ছি না, কিন্তু জ্বর কাশি নেই এমন কিছু লোক তো ভাইরাস ভেতরে নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের মুখ থেকে ভাইরাস ছিটকে বেরোচ্ছে, হাত যেখানেই রাখছে সেখানেই ভাইরাস রয়ে যাচ্ছে, এইসবে আমার ছোঁয়া একেবারেই লাগবে না, এ হলপ করে বলতে পারবো না। মানুষ ২৪ ঘণ্টা হয়তো সাবধান থাকতে পারে, পারে অল্প কিছু দিন;  প্রতিদিন নয়, দিনের পর দিন নয়। আমি হয়তো বাইরে বেরোচ্ছি না, কিন্তু বাইরে থেকে তো ঠিকই ঘরে কাজ করার লোক আসছে, ওরা তো সাত বাড়ি ঘুরে আমার বাড়ি আসছে। ওদের আমি প্রতিদিনই জিজ্ঞেস করি জ্বর কাশি নেই তো, ওরা না বলে। ওদের উত্তর আমাকে স্বস্তি দেয়। ওদের বলে দিই, কোনও রকম অসুস্থবোধ করলে যেন ডাক্তার দেখায় বা হাসপাতালে চলে যায়, বেতন নিয়ে ভাবতে হবে না, কাজ না করলেও পাবে। স্বস্তি তো ওদেরও দরকার।

ঢাকায় শুনেছি বিদেশ থেকে এক মেয়ে এসে তার মাকে ভাইরাস উপহার দিয়ে চলে গেছে, ভাইরাসে মা’র মৃত্যু হয়েছে। দিল্লিতেও ইতালি থেকে ছেলে ফিরে মা’র সঙ্গে ঘুরে বেরিয়েছে। সেও মা’কে উপহার দিয়েছে ভাইরাস। মা মারা গেছেন। কতটুকু দায়িত্বজ্ঞানহীন পুত্র-কন্যা! ভালো যে কোনও পুত্র-কন্যার জন্ম দিইনি। কোনও গ্যারেন্টি আছে জন্মালে দায়িত্বজ্ঞানহীন হতো না?

আমার এক বিদেশি বন্ধু বলেছে, এই ভাইরাস আমাদের সবাইকে ধরবে, কিছু আগে বা কিছু পরে। কেন বলেছে, কে জানে। আমি তো ভাবছি, আর কদিন পর ভাইরাস বিদেয় নেবে। আবার পৃথিবী আগের মতো হয়ে উঠবে, জীবন্ত। আশা না থাকলে কি বাঁচা যায়? আমার যদি শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তখনও আমার আশা ফুরোবে না, আমি বলবো আমি না হয় যাচ্ছি, কিন্তু বাকি মানুষ বেঁচে থাকুক, পৃথিবী বাসযোগ্য হোক আরও।

মার্চ ২১

আমাকে করোনাভাইরাস ধরলে আমি নির্ঘাত মরবো। কারণ আমার বয়স বেশি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। যখন আমার উপসর্গ শুরু হবে, কেউ আমাকে দেখতে আসবে না। সম্পূর্ণ একা তখন আমি। কী করবো তখন? প্রিয় রবীন্দ্রসংগীতগুলো শুনতে থাকবো। একসময় মরে যাবো। আমার মৃতদেহ দূরে কোথাও নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। আমি যে দিল্লির এইমস আর নিউইয়র্কের ল্যাংগনে মৃতদেহ দান করেছি, কোনও লাভ হবে না, ভাইরাসে মৃত্যু হলে ওরা দেহ নেয় না।

পৃথিবীটা হঠাৎ করে কীরকম ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এই পৃথিবীকে আমি চিনি না।

মার্চ ২২

কত নতুন তথ্য পাচ্ছি। কাচে, স্টিলে, প্লাস্টিকে করোনাভাইরাস ৯ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। বাতাসেও বেশ বেঁচে থাকে। কাগজেও থাকে, কাপড়েও থাকে। শুধু কাপড়ে থাকে কম, ৪ ঘণ্টা। করোনা (ঝঅজঝ-ঈড়ঠ-২) আক্রান্ত কেউ একবার কাশলেই তার মুখ থেকে ৩০০০ ড্রপলেটস বেরিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, ছোট ড্রপলেটস বাতাসে ভাসে। ওই ৩০০০-এর প্রতিটি থেকে আমরা আক্রান্ত হতে পারি। সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য এই- করোনা আক্রান্ত সবার কাশি জ্বর থাকে না। দিব্যি সুস্থ দেখতে, আসলে কিন্তু তার ভেতরে গিজগিজ করছে এই ভাইরাস। করোনার ভাইরাস ভেতরে নিয়ে কেউ কথা বলছে তোমার সামনে, তোমার নাক-মুখ দিয়ে ঢুকে পড়ছে ভাইরাস। সে যেসব জায়গায় স্পর্শ করেছে, সেসব জায়গায় তুমি স্পর্শ করলে তোমার হাতে চলে আসবে ভাইরাস। ভাইরাস তার শরীরে, অথচ কোনও উপসর্গ শুরু হয়নি, অন্যকে যে আক্রান্ত করার ক্ষমতা তার আছে, সে নিজেও জানে না। এ কারণেই এই ভাইরাস বিশ্বময় এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। জানি না এই ভয়ংকর ভাইরাসকে পরাজিত করার ক্ষমতা মানুষের আছে কি না। হয়তো নেই, হয়তো আমাদের সবাইকে ধরবে এই ভাইরাস। এরকম যখন ভাবছিলাম, তখন বিকেল ৫টা। বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম, সারা পাড়ার মানুষ যার যার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থালা কাঁসর-ঘণ্টা শঙ্খ যা পাচ্ছে, বাজাচ্ছে সেই ডাক্তার এবং নার্সদের উদ্দেশে, যাঁরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজ করছেন। সম্মিলিত শঙ্খধ্বনি যখন রেকর্ড করছিলাম মোবাইলে, মৃত্যুর সামনে দাঁড়ানো বিপন্ন জনমানুষের আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছিল চারদিকের ওই শব্দ, আমার চোখ থেকে তখন টপ টপ ঝরে পড়ছিল জল।

মার্চ ২৪

আমাদের হয়তো প্রস্তুত থাকা দরকার কিছু অনাকাক্সিক্ষত অবস্থার মুখোমুখি হওয়ার জন্য। যদি ভ্যাক্সিন চটজলদি না আসে, তা হলে যেভাবে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, এভাবে ছড়িয়ে পড়লে পৃথিবীর প্রায় সবাইকে এই ভাইরাস কামড় দেবে। দিলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের ভালো, যারা শক্তিমান, তারা ভাইরাসকে হারিয়ে দেবে, আর যাদের বয়স বেশি অথবা যাদের ডায়াবেটিস ইত্যাদি অসুখ আছে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা ভাইরাসের কাছে হেরে যাবে, হেরে যাবে মানে মরে যাবে। বিশ্বজুড়ে তাই তো হচ্ছে। মাত্র কদিনেই ২৩ হাজারের চেয়েও বেশি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ভাইরাস। পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে বয়স যাদের কম, সুস্থ এবং শক্তিমান যারা, তারা। তারা এই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেঁচে গেলে তাদের শরীরে করোনা প্রতিরোধের ক্ষমতা জন্ম নেবে। করোনা তখনই বিদেয় নেবে যখন কাউকে আর আক্রান্ত করতে পারবে না। সোশ্যাল আইসোলেশন আক্রান্তের সংখ্যা কমাতে পারবে, কিন্তু ভাইরাস দূর করতে পারবে না।

আমাদের জেনারেশন সাফ হয়ে যাবে। নতুনদের গড়তে হবে এক নতুন পৃথিবী। সেই পৃথিবী কেমন হবে, তা নির্ভর করে কারা পৃথিবী গড়ছে। নতুন সেই পৃথিবী যে খুব চমৎকার হবে তা আমার মনে হয় না। যখন ভাইরাসের বিরুদ্ধে সম্মিলিত লড়াইয়ে মানবতার স্বার্থে ঘরবন্দি থাকার চেয়ে জরুরি কাজ আর নেই, তখন যে ইয়ং নারী পুরুষ দিব্যি রাস্তায় বের হয়ে থালা বাজিয়ে নাচতে নাচতে করোনা ফেস্টিভ্যাল করেছে ভারতে, সিডনি আর সান্টা মারিয়ার সমুদ্র সৈকতে যে শত শত ইয়ং নারী পুরুষ সূর্য স্নান করতে বসে গেছে, বাংলাদেশে যে ছেলেগুলো মিছিল করেছে মসজিদে নামাজ পড়ার অধিকার দাবি করে, আর ইতালি থেকে ফিরে যারা কোয়ারেন্টাইনে না থেকে বাড়ি চলে গেছে, তাদের মতো বোকা বুদ্ধিসুদ্ধিহীন বিবেক-বর্জিতরাও কিন্তু বেঁচে থাকবে। তারা সমাজে কী ভূমিকা রাখবে সেটির ওপরও সমাজের গুণ-মান-চরিত্র নির্ভর করবে। প্রচুর গবেষক, বিজ্ঞানী, মানবতাবাদী, চিন্তক, লেখক, শিল্পীর মৃত্যু হবে। অনেক দক্ষ লোকই থাকবে না। সুস্থ শরীর দিয়ে যুদ্ধ জয় করা হয়তো যায়, কিন্তু পরিচ্ছন্ন সমাজ গঠন করতে সুস্থ মস্তিকের দরকার হয়। সেটির যেন অভাব না হয় আগামীর পৃথিবীতে।

মার্চ ২৫

লকডাউনে আমার খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না। ইউরোপ আমেরিকায় দীর্ঘকাল বাস করার কারণে রান্নাবান্না করা, বাসন ধোয়া, ঘরদোর গোছানো, ডাস্টিং, ঝাড়– মোছা, কাপড় ধোয়া, টয়লেট পরিষ্কার ইত্যাদি হাজার রকমের কাজ নির্বিঘেœ করে ফেলতে পারি। একা থাকতেও কোনও অসুবিধে কখনো হয়নি কারণ জীবনের অর্ধেকটা বয়স একাই থেকেছি আমি।

লকডাউনটা টিকা আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত চালু থাকলে ভালো হয়। এই সময় গরিবদের ঘরে ঘরে চাল ডাল আর টাকাকড়ি পৌঁছে দেওয়া দরকার। কিছু দেশ তো তাই করছে।

এই সার্স কোভ ২ ভাইরাস খুব বেশি বিবর্তিত না হলে টিকা আবিষ্কারে খুব বেশি দেরি হবে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ফ্লুর টিকার মতো প্রতি বছর নতুন নতুন টিকা নয়, এই টিকা একবারই নিতে হবে, হাম আর গুঁটিবসন্তের টিকার মতো।

ইতালি আর স্পেনের দিকে তাকানো যায় না। পিঁপড়ের মতো মানুষ মরছে। ইরান, আমেরিকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের শরীরে ভাইরাস ধরা পড়ছে। মানুষের জীবন যে কতটা কচুপাতায় জল, তা হাড়ে মজ্জায় যেন বোঝা হলো আবারও। মানব প্রজাতির সবচেয়ে বড় দুর্যোগের দিনে যারা ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, স্বার্থপরতা নিয়ে থাকছে, অন্যের ক্ষতি হলে যাদের কিছু যায় আসে না- তাদের কিন্তু চিনে রাখা বড় জরুরি।

দেখা যায় না এমন ছোট ভাইরাস আজ আমাদের প্রজাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। গোটা পৃথিবী লকডাউন, যেন নীলডাউন হয়ে ভাইরাসের কাছে প্রাণভিক্ষে চাইছে। মঙ্গলগ্রহে যাওয়া এবং বাস করার সব আয়োজন আমরা করে ফেলেছি, কত শক্তিশালী আমরা, অথচ কত শক্তিহীন!

এই সময় আমরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখলেও মানসিক দূরত্ব যেন ঘুচিয়ে ফেলি। ভাইরাস আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, আমরা মানুষ- এই আমাদের আসল পরিচয়। নারী পুরুষ, হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান ইহুদি নাস্তিক, ছোট বড়, ধনী গরিব, সাদা কালো বাদামি হলুদ, ফরাসি চৈনিক সিরীয় ভারতীয় আরব ওলন্দাজ আমরা সব এক। দেশে দেশে যে বেড়া দিয়েছি, তা নিতান্তই অর্থহীন।

                লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।


আপনার মন্তব্য