শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:২৮

মহিলারা কি কাজি হওয়ার যোগ্য নন?

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

মহিলারা কি কাজি হওয়ার যোগ্য নন?

কোনো আদালতে একটি রায় প্রকাশিত হওয়ার পর তার ওপর আলোচনা-সমালোচনায় বাধা থাকে না বলেই আমার এই লেখা, যা জনস্বার্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মেয়েদের মাসিক বা ঋতুস্রাবের কারণে তাদের কাজি পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে না বলে প্রথমে সরকার এবং পরে হাই কোর্ট রায় দিয়েছে জেনে আমি এবং আমার মতো অনেকেই শুধু অবাক নয়, বরং হতভম্ব। এ ব্যাপারে একটি টকশোতে আইনি অবস্থা বিস্তারিত বলার পর বহু গুণীজন আমাকে অনুরোধ করায় আমি এ বিষয়ে কলম ধরলাম।

প্রথমত বলতে হয়, আমাদের সংবিধানে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং পরিষ্কার ভাষায় নির্দেশনা রয়েছে যে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না, রাষ্ট্র ও নগরজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্ম নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না; কিংবা সেই ক্ষেত্রে তার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না। এই বিধানগুলো রয়েছে যথাক্রমে সংবিধানের ২৭, ২৮ এবং ২৯ অনুচ্ছেদে। এ কথা বলাই বাহুল্য, সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন যা মানতে প্রতিটি মানুষ, সরকার, পার্লামেন্টসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি কর্তৃপক্ষ এবং প্রতিটি আদালত বাধ্য এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণীত হতে পারে না। সেই অর্থে কোনো মহিলাকে, সে মহিলা বলে, কাজি পদে চাকরি না দেওয়াটা বা পরবর্তীতে হাই কোর্ট একই কারণে তার রিট খারিজ করা সংবিধানের সঙ্গে মারাত্মকভাবে সাংঘর্ষিক বলেই আমাদের বিস্ময়।

বলা হয়েছে, নারীদের প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের কারণে তারা সেই সময় কাজির দায়িত্বে অক্ষম। এই যুক্তি শুধু বিস্ময়করই নয়, কাজির দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনও বটে। তাই কাজি বা বিবাহ নিবন্ধকের দায়িত্বটা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। পদটির নাম, ‘নিকা রেজিস্ট্রার’ যা থেকেই তার দায়িত্ব বোঝা যায়, অর্থাৎ তার একমাত্র দায়িত্ব মুসলিম নিকাহ বা বিবাহ এবং তালাক রেজেস্ট্রি বা নিবন্ধন করা। এর বাইরে তার কোনো দায়িত্ব নেই। মুসলিম আইনে বিয়ে কোনো ধর্মীয় ব্যাপার নয়, এটি হচ্ছে একটি চুক্তি। স্যার ডি এফ মোল্লা, ভারতের সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং পরে উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি হেদায়েত উল্লাসহ মুসলিম আইনের সব বিশেষজ্ঞই এ কথা নিশ্চিত করেছেন, নিশ্চিত করেছেন প্রিভি কাউন্সিলসহ সব শীর্ষ আদালত। অন্য সব চুক্তির মতো এ চুক্তিতেও যেটি প্রয়োজন তা হলো উভয়পক্ষের অর্থাৎ বর এবং কনের সম্মতি। যা তারা ‘কবুল’ বলে প্রদান করেন। আইন অনুযায়ী প্রয়োজন হয় সাক্ষীর। একজন কাজির একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে বর-কনে কবুল বলে সম্মতি দিল কি না, প্রয়োজনীয় সাক্ষী উপস্থিত কিনা, উকিল বাপ সম্মতি দিল কিনা, বিবাহ সংক্রান্ত শরিয়ত এবং পার্লামেন্ট প্রণীত আইনি বিধানসমূহ মানা হচ্ছে কিনা, কত টাকা দেনমোহর নির্ধারণ হলো, স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করা হলো কিনা, বর-কনে বিয়ের বয়সে উপনীত হয়েছে কিনা, উভয়েই মুসলমান বা কনে মুসলিম না হলে কিতাবি কিনা, যা বৈধ বিয়ের জন্য প্রয়োজন, পাত্র-পাত্রী নিষিদ্ধ আত্মীয়তার মধ্যে কিনা, বহুবিবাহ বিরোধী আইন ভঙ্গ হচ্ছে কিনা, ইদ্দতকাল পার হয়েছে কিনা তা নির্ধারণ করা। এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর বিবাহ নিবন্ধক (কাজি) সাহেবের কাজ প্রয়োজনীয় ফরম পূরণ করে তাতে বর, কনে, উকিল বাপ এবং সাক্ষীদের দস্তখত গ্রহণ করে নিজে দস্তখত করে নিবন্ধনের কাজ সমাপ্ত করা। আর তখনই বিবাহ নিবন্ধকের (কাজির) দায়িত্ব শেষ। সহজ কথায় নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় কোনো উপাদান নেই। সুতরাং কাজি ঋতুস্রাবকালীন কি না সে বিষয়টি সম্পূর্ণ অবান্তর। আমাদের সামাজিক রীতি অনুযায়ী বিয়ের পর্ব শেষে মোনাজাত এবং দোয়া কালেমা পাঠের প্রচলন রয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে বিয়ে সম্পন্ন বা নিবন্ধনের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই এবং সেখানে কাজিরও কোনো ভূমিকা বা উপস্থিতিরও প্রয়োজন নেই। সেটি যে কোনো ব্যক্তি সম্পন্ন করতে পারেন যিনি দোয়া-কলেমায় শিক্ষিত। কাজি সাহেব ফরম পূরণের পরই বিয়ের স্থান ত্যাগ করতে পারেন। কেননা পরবর্তী কোনো কিছুতেই, অর্থাৎ দোয়া-কালেমা বা মোনাজাতে তার কোনো দায়িত্ব নেই।

মুসলিম বিবাহ নিবন্ধক হতে আলিম পাস হতে হয়। তার বয়স ২১ থেকে ৪৫ এর মধ্যে এবং তাকে স্থানীয় বাসিন্দা হতে হয়। কাজি বা বিবাহ নিবন্ধক পদটি মোটেও কোনো ধর্মীয় পদ নয়। এমনকি আলিম পাস করতে পারলে, অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একজন অমুসলিমও ‘কাজি’ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। আদিতে বিবাহ নিবন্ধনের কোনো আইন ছিল না, ছিল না বিবাহ নিবন্ধক বা কাজির পদের অস্তিত্ব। শরিয়তের আইনে বিয়ে নিবন্ধন বা কাজির কোনো কথা নেই। শরিয়তের বিধানে বর-কনে প্রয়োজনীয় সাক্ষীদের সামনে কবুল বললেই বিয়ে সম্পন্ন হয় যদি অন্য কোনো বাধা না থাকে। সেই বিধানে কোনো নিবন্ধনের বা নিবন্ধকের কথা বলা হয়নি। কিন্তু বিয়ে নিয়ে বহু ধরনের প্রতারণা গ্রামেগঞ্জে, শহরে ব্যাপকভাবে চলছিল বলে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বিবাহ এবং তালাক নিবন্ধন আইন প্রণয়ন করেন। এই আইন দ্বারাই বিবাহ-তালাক নিবন্ধনের বিধান করা হয় এবং বিবাহ-তালাক নিবন্ধকের পদ সৃষ্টি করা হয়, যে ব্যক্তিকে সাধারণভাবে কাজি বলা হয়। বিবাহ নিবন্ধনের বিধান সব উন্নত দেশেই রয়েছে। এটিও বলা প্রয়োজন যে, আমাদের আইনে বিয়ে নিবন্ধন না করলেও কিন্তু বিয়ের বৈধতা ক্ষুণœ হয় না। তবে নিবন্ধন না করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বিবাহ নিবন্ধন আইনের ৪ ধারা মতে নিবন্ধককে (কাজি) নিয়োগ দেওয়া হয় শুধু বিবাহ নিবন্ধনের জন্য। ৫ ধারায় বলা হয়েছে, যেখানে নিবন্ধক স্বয়ং বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করান সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নিবন্ধন কাজ সম্পন্ন করতে হয়। ৫/২ ধারা মতে যেখানে নিবন্ধক (কাজি) ছাড়া অন্য কেউ বিবাহ কার্য সম্পন্ন করেন সেখানে বরের ওপর দায়িত্ব বর্তায় ৩০ দিনের মধ্যে নিবন্ধককে (কাজি) বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে মর্মে জানিয়ে দেওয়া। ৫(৩) ধারা বলছে সে ক্ষেত্রে বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে জানার সঙ্গে সঙ্গেই কাজিকে বিবাহ নিবন্ধন করতে হয়। উপরে উল্লিখিত বিধান থেকে পরিষ্কার যে, বিয়ে যে কেউ সম্পন্ন করতে পারে, তবে পরবর্তীতে নিবন্ধন করতে হয় নিবন্ধক (কাজি)-কে।

বিয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই সম্পন্ন হয় বরের বা কনের বাড়িতে বা তাদের কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বা কোনো কমিউনিটি সেন্টারে। মসজিদে বিয়ে অনুষ্ঠানের ঘটনা অতি বিরল। সেই অর্থে ঋতুকালীন সময়ে মহিলা মসজিদে গিয়ে বিয়ে নিবন্ধন করতে অক্ষম বলে যে খোঁড়াযুক্তি দেওয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। আরও বলা হয়েছে, কাজিকে রাত বেরাত যাতায়াত করতে হয় বিধায় মহিলারা এ পদের অযোগ্য। এই হাস্যকর যুক্তি মেনে নিলে সব মহিলা ডাক্তারকে হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকতে হবে, মহিলা গার্মেন্ট কর্মীর অভাবে গার্মেন্ট শিল্প বন্ধ করতে হবে, কোনো মহিলা পুলিশ পদেও চাকরি করতে পারবেন না, পারবেন না সামরিক বাহিনীতে চাকরি নিতে, কোনো মহিলা শিল্পী হিসেবে পেশা চালাতে পারবেন না, নারীরা সংবাদিক হতে পারবেন না, পারবেন না ব্যাংকে চাকরি করতে। এ ছাড়াও আরও অনেক পেশায় বা চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন না। এমনকি তারা আইন পেশায়ও যেতে পারবেন না। এখানে উল্লেখ্য, দেশের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই আইনের ৪ ধারা মতে নিবন্ধক নিয়োগের সিদ্ধান্ত সরকারের তথা আইন মন্ত্রণালয়ের। উপদেষ্টা পরিষদ যে তিনজনের নাম পাঠান তার মধ্য থেকেই একজনকে লাইসেন্স প্রদান করেন মন্ত্রণালয়। তবে নিশ্চয়ই মন্ত্রী মহোদয় নিজে সিদ্ধান্ত নেন না, নিয়ে থাকেন তার মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা। একটি ভুল কথা বহুলভাবে প্রচলিত এই মর্মে যে বিবাহ নিবন্ধক (কাজি)-কে কালেমা পড়তে হয়, মোনাজাত করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও বোধ হয় সেই ভুল কথা দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে, যদিও নির্ভুল কথা হলো এই যে কালেমা পড়ান বা মোনাজাত বিবাহ নিবন্ধকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।

২০০৯ সালের নিবন্ধন রুল অনুযায়ী নিবন্ধককে (কাজি) আলিম পাস হতে হয়। এই পড়াশোনার যোগ্যতার প্রয়োজন রয়েছে, কেননা নিবন্ধককে মুসলিম বিবাহ সংক্রান্ত শরিয়তের বিধান এবং অন্যান্য প্রণীত আইন জানতে হয়। তাকে নিশ্চিত হতে হয় বাল্যবিবাহ-বিরোধী আইন ভঙ্গ হচ্ছে না, বর-কনে নিষিদ্ধ আত্মীয়তাভুক্ত নয়, বহু বিবাহবিরোধী আইন ভঙ্গ হচ্ছে না, দুজনই হয় মুসলিম অথবা বর মুসলিম কনে কিতাবি কিনা, ইদ্দতকাল পার হয়েছে কিনা, তাকে তালাক সংক্রান্ত শরিয়তের আইন এবং ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশে প্রদত্ত বিধানসমূহ জানতে হয়। রুল অনুযায়ী তার বয়স ২১ থেকে ৪২ হতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা হতে হয়। ১৯৮৩ সালের আগের রুলে বলা হয়েছিল বিয়ে নিবন্ধন হবে বর বা কনের বাড়িতে। কিন্তু বর্তমান রুল বলছে নিবন্ধন হতে হবে নিবন্ধক (কাজির) এখতিয়ারভুক্ত এলাকায়। অর্থাৎ মসজিদে বিয়ের কথা নেই। রুলে বলা হয়েছে, নিবন্ধক যদি বিবাহ উৎসবে উপস্থিত থাকে। তবে তা রেজিস্ট্রিতে লিখতে হবে। এই রুল থেকে পরিষ্কার যে, তাকে নিবন্ধনের পর আর বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকতে হয় না মোনাজাত বা কালেমা পাঠের জন্য।

আদালতকে বোঝানোর দায়িত্ব কিন্তু আইনজীবীদের। এই রিট মামলায় রিটকারীর আইনজীবী আইনের দিকগুলো আদালতকে ঠিকভাবে বোঝাতে পরেছেন কিনা সেটি একটি প্রশ্ন বটে। সে যাই হোক, রায়টি নিশ্চিতভাবে সংবিধানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এবং যুক্তিগুলো আইনের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য হওয়ায় এটা আশা করা যায় যে, আপিল বিভাগে এ রায় বাতিল হয়ে যাবে।

            লেখক : আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।


আপনার মন্তব্য