বুধবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ টা

জানকীনাথ ঘোষালকে জুতো পরিয়ে দিলেন গান্ধী

সাইফুর রহমান

জানকীনাথ ঘোষালকে জুতো পরিয়ে দিলেন গান্ধী

তা বোধকরি ১৯১৫ সালের জানুয়ারি। মহাত্মা গান্ধী এসেছেন কলকাতায় কংগ্রেস পার্টির একজন সাধারণ প্রতিনিধি হয়ে। কংগ্রেসের অন্য প্রতিনিধিরা মূল অধিবেশনের আগে সাধারণত শুয়ে-বসে আলস্য সময় কাটাচ্ছিলেন। আলস্য কাকে বলে তা জানা নেই মহাত্মা গান্ধীর। স্বেচ্ছায় কিছু কাজ করতে চান বলে তিনি কিছু ঊর্ধ্বতন কংগ্রেস নেতার শরণাপন্ন হলেন। গান্ধীকে দিয়ে কী কাজ করানো যায়? এসব ভেবে ভেবে জনৈক নেতা তাঁকে পাঠালেন জানকীনাথ ঘোষালের কাছে। কে এই জানকীনাথ ঘোষাল? একটু পরিচয় করিয়ে না দিলে অনেক পাঠকই হয়তো তাঁকে চিনতে পারবেন না। কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সেবারের কংগ্রেস অধিবেশনের সম্পাদক ছিলেন জানকীনাথ। তাঁর আরও কিছু পরিচয় হলো তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভগ্নিপতি অর্থাৎ কবিগুরুর জ্যেষ্ঠ ভগ্নি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতকার ও সংস্কারক স্বর্ণকুমারী দেবীর স্বামী ও সরলা দেবী চৌধুরাণীর বাবা।

১৮৬৮ সালে জানকীনাথ ঘোষালের সঙ্গে স্বর্ণকুমারী দেবীর বিয়ে হয়। জানকীনাথ ছিলেন নদীয়ার এক জমিদার পরিবারের শিক্ষিত সন্তান। ঠাকুর পরিবার ছিল পিরালিভুক্ত ব্রাহ্মণ। পিরালি ব্রাহ্মণ বংশের কন্যাকে বিয়ে করায় জানকীনাথ পরিবারচ্যুত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যবসা করে সাফল্য অর্জন ও নিজস্ব জমিদারি গড়ে তুলে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন। তিনি ছিলেন একজন দিব্যজ্ঞানবাদী (থিওজফিস্ট) এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা আদিযুগের সক্রিয় সদস্য। জানকীনাথ ও স্বর্ণকুমারী দেবীর তিন সন্তান। তাঁরা হলেন হিরণ¥য়ী দেবী (১৮৭০-১৯২৫), জ্যোৎস্নানাথ ঘোষাল (১৮৭১-১৯৬২) ও সরলা দেবী চৌধুরাণী (১৮৭২-১৯৪৫)। জ্যোৎস্নানাথ ঘোষাল আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পশ্চিম ভারতে কর্মে বহাল হয়েছিলেন।

সে যাক, জানকীনাথ ঘোষাল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর অতি সাধারণ বেশভূষা ও পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে ভাবলেন এ ছোকরা হয়তো অতি সাধারণ কেউ। শিক্ষা-দীক্ষাও সামান্যই হবে হয়তো। তিনি তাঁকে উদ্দেশ করে বললেন- ‘দেখ বাপু ওদিকের টেবিলটায় রাজ্যের সব চিঠি স্তূপ হয়ে আছে। সব চিঠি কি আর আমার একার পক্ষে পড়া সম্ভব? নাকি পড়ার যোগ্য। তা ভাই তুমি যদি চিঠিগুলো একটু উল্টেপাল্টে দেখ। কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা ভাগাড়ে যাওয়ার উপযুক্ত। তা তুমি চিঠি পড়তে জানো তো নাকি?’ গান্ধী যে সদ্যই বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে ফিরেছেন তা তিনি গোপন রাখলেন সন্তর্পণে। বিনা বাক্যব্যয়ে একজন অনুগত কেরানির মতো গান্ধী বসে গেলেন চিঠি পড়তে। আর সেদিনই তাঁর জীবনে ঘটল ভিন্ন রকম একটি ঘটনা। জমিদারতনয় জানকীনাথ নিজে নিজে কখনো জুতার ফিতা ও কোটের বোতাম লাগাতে পারতেন না কিংবা লাগাতেন না। এসব কাজে সাধারণত সাহায্য করত তাঁর এক ভৃত্য। বিকালে কাজ শেষে জানকীনাথ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রিয় ভৃত্যটিকে ডাকাডাকি শুরু করলেন। কিন্তু ভৃত্যটি তখন ধারেকাছে না থাকায় গান্ধীর দিকে এমনভাবে তাকালেন জানকীনাথ, ভাবে মনে হলো গান্ধী এসে তাঁর জুতার ফিতা ও কোটের বোতামগুলো লাগিয়ে দিক। মুখে যদিও তিনি কিছু বললেন না অবশ্য। ব্যাপারখানা বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে জানকীনাথের জুতার ফিতা ও কোটের বোতামগুলো লাগিয়ে দিলেন গান্ধী। পরে অবশ্য জানকীনাথ আরেক বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা গোখলের কাছ থেকে জেনেছিলেন যে ওই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামে যে তরুণটিকে দিয়ে তিনি সেদিন কেরানি ও আরদালির কাজ করিয়েছিলেন আসলে তিনি ছিলেন একজন বিলেতফেরত ব্যারিস্টার। উপরোক্ত ঘটনাটি ইতিহাসের পাতা থেকে ধুলাবালি ঝেড়ে তুলে ধরলাম এ কারণে যে, সত্যি সত্যি যদি কেউ বড় হতে চায় তাহলে তাকে আগে ছোট হতে হয়। নিরহংকার হতে হয়। বিনয়ী হতে হয়। আর এজন্যই কবি লিখেছেন- ‘গুণেতে হইলে বড়, বড় বলে সবে/বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে।’ আজকের এ লেখাটি লিখতে প্রলুব্ধ হলাম এজন্য যে আমাদের চারদিকে আত্ম অহংকারী কিংবা ‘মুই কী হনু রে’ জাতীয় মানুষের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে তাদের অহংকার করার মতো হয়তো কিছুই নেই, তার পরও তাদের পা যেন মাটিতে পড়ে না- এ-জাতীয়। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এ ধরনের মানুষের আধিক্য থাকলেও রাজনীতিই কেন জানি এ ধরনের মানুষে একেবারে ভর্তি। বিশেষ করে অনেক রাজনীতিবিদের মুখে প্রায়ই ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে মনে হয় যেন আজকেই পৃথিবীর শুরু এবং আজকেই এর শেষ। এর আগেও কিছু ছিল না আর ভবিষ্যতেও কিছু ঘটবে না। অথচ ইতিহাস পড়লে জানা যায় বুদ্ধ, খলিফা ওমর, আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী, ম্যান্ডেলা, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, সক্রেটিস, কনফুসিয়াস, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, তলস্তয়, মাদার তেরেসাসহ আরও কত শত সহস্র মনীষী যাঁরা ছিলেন মানবতাবাদী, বিনয়ী ও নিরহংকার।

আমরা আমাদের জীবনের একেবারে শৈশব থেকে যুগ যুগ ধরে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রণীত ‘বড় কে?’ কবিতাটি পড়ে আসছি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। কিন্তু এ কবিতাটির তাৎপর্য কিংবা এর এতটুকু প্রভাবও কি আমাদের জীবনে কখনো পড়েছে। এখানে প্রসঙ্গক্রমেই বলতে হয়, ২০১৫ সালে দেখলাম এ কবিতাটির কবির নামও পাঠ্যপুস্তক থেকে পাল্টে গেছে। এত দিন আমরা জানতাম ‘বড় কে?’ কবিতাটির লেখক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এখন আবার বলা হচ্ছে এ কবিতার জনক হরিশচন্দ্র মিত্র। সঠিক ইতিহাস নিয়েও এখানে ঘটানো হচ্ছে তুঘলকি কান্ড। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত রচিত ‘বড় কে?’ কবিতাটিতে আমার দুটি প্রিয় লাইন ছিল এ রকম- ‘হিতাহিত না বুঝিয়া মরে অহংকারে/নিজে বড় হতে চায়, ছোট বলি তারে।’ কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে হরিশচন্দ্র মিত্রের কবিতাটিতে এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরণও বেমালুম গায়েব। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী এমন জাদুকরি পরশপাথর যার স্পর্শে কিছু মানুষ এমন বিনয়ী ও নিরহংকার হয়ে ওঠে। আর কিছু মানুষ থেকে যায় অহংকারী, বর্বর, হিংস্র ও দাম্ভিক। আমার মতে এ পরশপাথরটি হচ্ছে পড়াশোনা। তবে এ কথা আমাকে স্বীকার করতেই হচ্ছে যে অনেক মানুষ সহজাত ও জন্মগতভাবেই হয় অহংকারবিবর্জিত, সদালাপী। গান্ধীজি সহজাতভাবে যেমন বিনয়ী ছিলেন তেমনি বইও পড়তেন প্রচুর, যদিও তিনি তাঁর আত্মকথায় বলেছেন, ‘বিদ্যাভ্যাসকালে আমি পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কিছুই পড়ি নাই বলা যায়। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিবার পরও খুব কম পড়িয়াছি। এমনকি আজও এ কথা বলা যায় যে আমার পুস্তকের জ্ঞান খুবই সীমিত।’ গান্ধীজির আগ্রহ ছিল বিচিত্র ধরনের বই সম্পর্কে। তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায় মহাদেব দেশাইয়ের দিনলিপি থেকে। ১৯৩২ সালে তিনি যখন ইয়ারবেদা জেলে তখন গান্ধী জানতে চান জেল লাইব্রেরিতে স্কট, মেকলে, জুলভার্ন, ভিক্তর হুগোর বই এবং কিংসলির ‘ওয়েস্টওয়ার্ড হো’ এবং গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ আছে কি না। জেলে বসেই গান্ধীজি পড়েছেন কার্লাইলের ‘ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস’। গিবনের ‘রোম সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস’ও তিনি পড়েছেন জেলে বসেই, ১৯২২ কি ১৯২৩ সালে। সারা জীবনে গান্ধীজি কত বই পড়েছেন তা লিখতে গেলে ফুল-স্কেপ কাগজের ১০-১২ পৃষ্ঠা শুধু তাঁর পড়াশোনার ওপরই লেখা যায়। এত বইপত্র পড়ার পরও একজন মানুষ কতটা বিনয়ী হলে বলতে পারেন, আমি পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কিছুই পড়িনি। তবে মহাত্মা গান্ধীর জীবনে সম্ভবত দুজন লেখকের দুটি বই সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছিল। প্রথমটি জন রাসকিনের (১৮১৯-১৯০০) ‘আনটু দিস লাস্ট’ এবং দ্বিতীয়টি লিও তলস্তয়ের (১৮২৮-১৯১০) ‘এ লেটার টু হিন্দু’। রাসকিনের আনটু দিস লাস্ট বইটি যে গান্ধীর ভালো লাগবে এটি অতি সাধারণ কথা। কারণ এ বইটিতে লেখক বলেছেন, সমষ্টির মঙ্গলই ব্যষ্টিক কল্যাণ। উকিল ও নাপিতের জীবিকা অর্জনের সমান অধিকার সুতরাং তাদের পারিশ্রমিকের হার একই নীতিতে নির্ধারিত হবে। কৃষক, মজুর প্রভৃতি যারা কায়িক পরিশ্রম করেন তাদের জীবনই আদর্শ জীবন। অন্যদিকে গান্ধী তাঁর দিগি¦জয়ী ‘অহিংসা’ দর্শনটির ধারণা পেয়েছিলেন প্রখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের থেকে। তলস্তয় তাঁর ‘এক হিন্দুকে লেখা চিঠি’ বইটিতে বলেছেন, ‘অহিংসাই ব্রিটিশের হাত থেকে ভারতের মুক্তির একমাত্র পথ।’ লিও তলস্তয়ের লেখনীর দ্বারা গান্ধী এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে ১৯১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের কাছে একটি সমবায় খামারের নাম তিনি তলস্তয়ের নামে রেখেছিলেন। তবে এটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক যে গান্ধীর দার্শনিক গুরু লিও তলস্তয় কিন্তু যৌবনে ছিলেন অহংকারী, দাম্ভিক, স্বার্থপর। আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদ ও শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তির মতো। তলস্তয় তাঁর আত্মকথনে লিখেছেন- ‘সেই সময় আমি লিখতে শুরু করেছিলাম দম্ভ থেকে, স্বার্থপরতা থেকে, আত্মশ্লাঘা থেকে। আমার জীবন যে রকম, লেখার ক্ষেত্রেও তাই। যশ ও অর্থের লোভে আমার ভালোত্ব লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল, খারাপ মনোবৃত্তিগুলো প্রকাশ করতে হয়েছিল। আর আমি সফল হয়েছিলাম, প্রশংসিত হয়েছিলাম।’ কিন্তু পরিণত বয়সে আত্মানুসন্ধান করতে গিয়ে তলস্তয় বুঝতে পারেন এগুলো সবই ভ্রান্ত, কুহক ও অপ্রয়োজনীয়। তলস্তয় যেমনটি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন- আত্মানুসন্ধানের জন্য তলস্তয় গিয়েছেন রাজা সলোমনের কাছে। ‘সলোমন বলছেন, দম্ভ, আত্মশ্লাঘা, শুধুই তাই। সূর্যের নিচে কী লাভের আশা করে মানুষ তার শ্রমের জন্য? প্রজন্ম যায়, প্রজন্ম আসে, পৃথিবী টিকে থাকে। ... প্রজ্ঞাকে জানার জন্য আমি হৃদয় সঁপে দিয়েছি, উন্মত্ততা আর অপরাধকে জানার জন্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞার মধ্যে আছে দুঃখ। যার জ্ঞান বাড়ে তার কষ্টও বাড়ে। ... জীবিতরা জানে তারা বাঁচবে না, মৃতরা কিছুই জানে না, তাদের কোনো পুরস্কার নেই, তাদের স্মৃতি মুছে যাবে, মুছে যাবে তাদের প্রেম ও ঘৃণা, তাদের ঈর্ষা ধ্বংস হয়ে যাবে।’

একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সর্বদাই ইতিহাসের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটে। সবকিছুই কিন্তু ঘুরেফিরে পুনরায় ফেরত আসে। সেজন্যই আমাদের শিক্ষা নিতে হবে নেলসন ম্যান্ডেলার মতো মানুষের কাছ থেকে। যিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। জেলখানায় বসেও প্রায়ই তাঁর সতীর্থ কয়েদিদের কাপড় কেচে দিতেন নিজ হাতে। অথচ তিনি জন্মেছিলেন তাঁর অঞ্চলের গোত্রপ্রধানের ঘরে। কনফুসিয়াস কুইং ডায়নেস্টির রাজ্যে দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। একটি স্বরাষ্ট্র অন্যটি আইন। কিন্তু তাঁর ঘরে তেমন কোনো আসবাব ছিল না। হাঁস-মুরগিগুলো ঘরের একদিক দিয়ে প্রবেশ করে ওদের স্বভাবসুলভ শব্দ করতে করতে বেরিয়ে যেত অন্য দিক দিয়ে। ভাবতেই অবাক লাগে, সত্যি রূপকথার মতো ছিল তাঁদের জীবনযাপন। তবে কনফুসিয়াসের ঘরে ছিল হাজার দুই বই। সক্রেটিস কিংবা বিদ্যাসাগরের মতো মানুষ এত বড় জ্ঞানী হয়েও অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। গ্রিসে ডায়াজেনিসের মতো বিশ্ববরেণ্য দার্শনিকরা বাস করতেন কুঁড়েঘরে। আর সেজন্যই সম্ভবত আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বলেছিলেন, ‘আমি যদি আলেকজান্ডার না হতাম তবে আমি ডায়াজেনিস হতে চাইতাম।’ আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার মতো দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও দু-চারটির বেশি পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল না তাঁর। লিংকনেরই অন্য একটি প্রসঙ্গ সম্পর্কে বলে লেখাটি শেষ করছি। সেটা আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময়কার ঘটনা। লিংকনের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্য জেনারেল ফ্রেমন্টকে পদচ্যুত করে মিত্রবাহিনীর সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য ম্যাকক্লেলানকে। কিন্তু অচিরেই ম্যাকক্লেলান সম্পর্কে মোহ ভঙ্গ হলো লিংকনের। প্রতিনিয়তই ম্যাকক্লেলান সেনাপতি হিসেবে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। সেসব বিষয়সহ আগামী দিনের রণকৌশল সম্পর্কে জানতে লিংকন স্থির করলেন তিনি নিজে যাবেন ম্যাকক্লেলানের ঘরে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিওয়ার্ড লিংকনকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘ম্যাকক্লেলানকে রাষ্ট্রপতি ভবনেই ডেকে পাঠানো হোক।’ সে কথা না শুনে লিংকন নিজে গিয়ে হাজির হলেন ম্যাকক্লেলানের ঘরে। গৃহকর্ত্রী জানালেন, সেনাপতি ম্যাকক্লেলান বাড়ি নেই। লিংকন অপেক্ষা করতে লাগলেন সেনাপতির জন্য। খানিক পরে ম্যাকক্লেলান বাড়িতে ঢুকেই দেখলেন লিংকন ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য তাঁর অপেক্ষায় বসে আছেন। কিন্তু সেদিকে এতটুকু ভ্রুক্ষেপ না করে তিনি গট গট করে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলেন দোতলায়। পরে ভৃত্যকে দিয়ে ম্যাকক্লেলান খবর পাঠালেন, তিনি অসুস্থ, তাঁর পক্ষে নিচে এসে লিংকনের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়। সিওয়ার্ড ম্যাকক্লেলানের এহেন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সহ্য করতে না পেরে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, মি. প্রেসিডেন্ট! একে এক্ষুনি বরখাস্ত করুন। লিংকন সিওয়ার্ডকে উদ্দেশ করে বললেন, জাতির এ সংকটকালে ভদ্রতাহানির ব্যাপারকে গুরুত্ব দেওয়া মোটেও উচিত হবে না। লিংকন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, শোনো সিওয়ার্ড, ম্যাকক্লেলান যদি যুদ্ধে জয়ী হতো তাহলে আমি তাঁর ঘোড়ার রেকাব ধরতেও আপত্তি করতাম না। লেখক হিসেবে শুধু আমার এটাই দুঃখ যে আমাদের দেশের কেউই কোনো দিন এসব ইতিহাসের দু-চার লাইন পড়ে দেখলেন না। বড়ই আফসোস!

লেখক : গল্পকার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

Email : [email protected]

সর্বশেষ খবর