Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ মে, ২০১৮ ০০:১৮

ট্রাম্প এন্ড কিম কাহিনী

সাইফ ইমন

ট্রাম্প এন্ড কিম কাহিনী

কিছুদিন আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কিম জং উনের নাম দিয়েছিলেন ‘রকেটম্যান’, আর এর জবাবে কিম ট্রাম্পকে বলেছিলেন ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’। দুপক্ষই একে অপরকে এমন হুমকি-ধমকির মধ্যে রেখেছিল যে, পুরো বিশ্বের মধ্যে একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বৈঠকে বসতে যাচ্ছে দুই পক্ষ। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তিনি কিম জং উনকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে রাজি করাতে পারবেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে নিয়ে আজকের রকমারি—

 

সিঙ্গাপুরে ঐতিহাসিক বৈঠক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাাম্প বলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার শীর্ষ বৈঠকটি হবে সিঙ্গাপুরে জুন মাসের ১২ তারিখে। এক টুইটার বার্তায় ট্রাম্প বলেন, দুই নেতাই চেষ্টা করবেন যেন এ বৈঠকটি বিশ্বশান্তির জন্য একটা অনন্য মুহৃর্ত হয়ে ওঠে। শীর্ষ বৈঠকটির লক্ষ্য হবে ওয়াশিংটন এবং পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির একটা সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা করা। উত্তর কোরিয়ায় আটক থাকা তিনজন আমেরিকান ফেরত পাওয়ার পরই ট্রাম্পের দিক থেকে এ ঘোষণা আসে। মুক্তি পাওয়া তিনজনের দুজন উত্তর কোরিয়ায় ইভানজেলিকাল খ্রিস্টানদের প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কাজ করতেন। তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন একজন খ্রিস্টান যাজক। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর পিয়ংইয়ং সফরকালে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের একটি আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জানান, বৈঠক হওয়ার আগ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া তাদের সব পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হুমকি ও পাল্টা হুমকির ঘটনা ঘটেছে। দুই নেতার আলোচনার টেবিলে বসার বিষয়টিকে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখছে বিশ্ব নেতারা। বৈঠকে উত্তর  কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়েই মূলত আলোচনা হবে। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই পিয়ংইয়ংয়ের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র পরিহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে উত্তর কোরিয়া বৈঠকের আলোচ্যসূচি নিয়ে কিছু জানায়নি বা তারা কী প্রস্তাব দিতে পারে তারও কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।

ধারণা করা হচ্ছে আসন্ন বৈঠকে উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেবে এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও স্থগিত করবে। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা বৈঠকের আয়োজক দেশ হতে পেরে আনন্দিত। এ বৈঠকের মধ্য দিয়ে কোরিয়া উপদ্বীপে শান্তির সম্ভাবনা জেগে উঠবে বলেই তারা আশাবাদী। সিঙ্গাপুরে এর আগেও উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। ২০১৫ সালে চীন এবং তাইওয়ানের দুই নেতা সিঙ্গাপুরেই ৬০ বছরের মধ্যে প্রথম ঐতিহাসিক বৈঠক করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও সিঙ্গাপুরের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। তবে উত্তর কোরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কঠোর হওয়ার পর গত বছর নভেম্বরে দেশটির সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করেছে সিঙ্গাপুর।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিনে নিন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সারা বিশ্বে অত্যন্ত বিতর্কিত এক ব্যক্তি। তার মানসিক সুস্থতা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, মুসলিম বিদ্বেষ, বর্ণবাদের মতো গুরুতর সব অভিযোগ রয়েছে। ট্রাম্পের ক্ষমতার বয়স এক বছরের কিছু বেশি। তার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কুইন্সে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট। ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি শপথ নেন ট্রাম্প। অনেক আগে থেকে মার্কিন সমাজে ট্রাম্প একজন ধনকুবের হিসেবে পরিচিত। তার জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ব্যবসা-বাণিজ্য আর শোবিজ নিয়ে। ২০১৫ সালের ১৫ জুন ব্যবসায়ী ট্রাম্প আচমকা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা নিয়ে হাসিঠাট্টাও হয়েছিল প্রচুর। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বরের  প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সব ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হিলারি ক্লিনটনকে পরাজিত করে হোয়াইট হাউসের টিকিট পান ট্রাম্প। তার জয়ী হওয়ার পেছনে নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ আছে। এই নিয়ে তদন্ত চলছে। ট্রাম্পের বাবা ছিলেন নিউইয়র্কের আবাসন ব্যবসায়ী। আর মা মেরি ট্রাম্প স্কটিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন। ছোটবেলা থেকেই ট্রাম্প চঞ্চল স্বভাবের হওয়ায় তাকে নিউইয়র্ক মিলিটারি একাডেমি স্কুলে দেওয়া হয়। ১৯৬৮ সালে ট্রাম্প পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ারটন স্কুল থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক করেন। পরবর্তীতে পৈতৃক ব্যবসার সম্প্রসারণ করেন তিনি। তিনি গড়ে  তোলেন হোটেল, বহুতল ভবন, গলফ কোর্স, ক্যাসিনো, নানারকম ব্যবসা। এক সময় ট্রাম্প মিস ইউনিভার্সের স্পন্সর ছিলেন। একটি টিভি রিয়েলিটি  শো উপস্থাপনা করে তারকা বনে যান। মজার ব্যাপার, তিনি রেসলিং ম্যাচও উপস্থাপনা করেছেন। ট্রাম্প বিয়ে করেছেন তিনটি। তার পাঁচ সন্তান রয়েছে। তার প্রথম স্ত্রী চেক মডেল ইভানা। ১৯৯২ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। দ্বিতীয় স্ত্রী মার্লা ম্যাপলস। বিচ্ছেদ হয় ১৯৯৯ সালে। ২০০৫ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন মডেল মেলানিয়াকে। তিনিই এখন ফার্স্ট লেডি। অভিবাসী, মুসলমান, নারী, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। সব সময় আলোচনায় থাকতেও ভালোবাসেন তিনি। নানা সময়ে টুইটারে টুইট করে সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন নিয়মিত। এক কথায় ট্রাম্প মানেই আলোচনা-সমালোচনা।

 

কেমন মানুষ কিম জং উন

কিছুদিন আগেও বিশ্বের কাছে অচেনা ছিলেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। ২৭ বছর বয়সে নেতৃত্বে আসেন কিম। কিন্তু শাসনভার হাতে নেওয়ার পরই তিনি পুরো বিশ্বের কাছে হয়ে ওঠেন অসীম আগ্রহের ব্যক্তি। ক্ষেপাটে এই নেতা উত্তর কোরিয়ায় চুলের বিচিত্র ধরনের স্টাইলের প্রচলন করেন। পাশাপাশি পোশাকে নিরবচ্ছিন্ন ভিন্নতা ও অদ্ভুত সব নিয়ম-কানুনের প্রচলন করেন। শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান আর কথায় কথায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। বিশ্ব গণমাধ্যমে তিনি এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত বিলাসী তিনি। বাহারি সিগারেট, প্রাইভেট জেট এবং সুস্বাদু ক্যাভিয়ার উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের অভাব নেই কিছুরই। বিশ্বে ধনীরাই বিলাসী জীবনযাপন করে থাকেন। এদিকে বিলাসিতায় উত্তর কোরিয়ার এই নেতা ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে। কিম জং উন কোথায় থাকেন বা তার বাসস্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়াটাও কষ্টকর। কারণ দেশজুড়ে তার ১৭টি প্রাসাদ আছে। আছে তার সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি দ্বীপ। সেখানে তিনি প্রায়ই সময় কাটাতে যান। এক কথায় পৃথিবীর বুকেই তিনি বানিয়ে নিয়েছেন স্বর্গ। তিনি প্রচুর মদ পান করেন। তিনি এবং তার অভিজাত নিকটজনদের জন্য শুধু মদ আমদানি করতেই বছরে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেন। এই খরচ বহন করে সরকারি কোষাগার। হেনেসির মতো দামি ব্র্যান্ডের হুইস্কি ছাড়া তার চলে না। শুনলে অবাক হবেন, তার প্রতি রাতের প্রতি বোতল হুইস্কির দাম দুই হাজার ডলারেরও বেশি। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও তার রয়েছে ব্যাপক বাছ-বিচার! তার খাবার-দাবার আসে একেক দেশ থেকে। ডেনমার্ক থেকে আসে মানসম্মত পোর্ক, ইরান থেকে আসে ক্যাভিয়ার, চীন থেকে আসে তরমুজ, আর গোমাংস থেকে তৈরি জাপানের অত্যন্ত সুস্বাদু ‘কোবে’ পছন্দ কিমের। কিম জং উন ধূমপায়ী। এক্ষেত্রে তার পছন্দ বাহারি ফ্রেঞ্চ সিগারেট। সিগারেটের পেছনে অনেক খরচ করেন তিনি। ফরাসি কোম্পানি দ্য ইয়েভস  সেইন্ট লরেন্টের বানানো সিগারেট তার পছন্দ। প্রতি পিসের দাম ৪৪ ডলার। আর এই সিগারেট বহনের জন্য যে চামড়ায় তৈরি ব্যাগ ব্যবহার করা হয় তার দাম ১৪৪ ডলার। সমুদ্রের বুকে উদ্দাম গতিতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য তার রয়েছে বিলাসবহুল ইয়ট। প্রায় আট মিলিয়ন ডলার মূল্যের নিজস্ব ইয়ট নিয়ে সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়ান কিম।

 

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রচলিত সব ধারা ভেঙে ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। তার বেশির ভাগ সিদ্ধান্তে প্রায়ই অনিশ্চয়তা থাকে। এর ফলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়ে। খামখেয়ালিপনা সিদ্ধান্ত  আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর স্থিতিশীলতার জন্য মোটেই সহায়ক হয় না।

গ্যালপ সংস্থার জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, এক বছরে আমেরিকার বাইরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ৩০ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

বিদেশে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে চিন্তিত মনে হয় না ট্রাম্পকে। সিরিয়ার  প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ এনে দেশটির একটি বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হামলা চালানোর পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন-মস্কো সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে ট্রাম্প। আফগানিস্তানের নানগরহার প্রদেশে ইসলামিক স্টেটের অবস্থান লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। ফলে আবারও বিশ্ব রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হন ট্রাম্প। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অস্বীকার করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি বর্জন করেন।

ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব তিনি অব্যাহত রেখেছেন। জেরুজালেম শহরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করার মাধ্যমে ট্রাম্প দেশ-বিদেশে তীব্র নিন্দার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবে তিনি তা পরোয়া করেননি বরাবরের মতোই। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন ট্রাম্প। বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রাচীর নির্মাণের ব্যয়ও মেক্সিকোকে বহন করতে হবে বলে দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করারও হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। অবশ্য এখনো পর্যন্ত এই দুটি ক্ষেত্রেই কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

 

কিমের পররাষ্ট্রনীতি

উত্তর কোরিয়ার নেতা হুট করে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করে ফেলেছেন। তবে দেশটি হুট করে তার সব পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি একেবারেই বাদ দিয়ে দেবে এমনটাও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে অনেকের। তা ছাড়া উত্তর  কোরিয়ার এই নেতা কখন, কী করে বসেন, তা বোঝা দায়। ট্রাম্পের সমর্থকরাও স্বীকার করেন, কিমকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না।

অনেকেই মনে করেন, কিম সম্ভবত কখনোই তার সব পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করবেন না। অনেকেই ধারণা করছেন হয়তো তিনি এই প্রকল্প সীমিত করতে পারেন। যাতে প্রতিবেশীরা ও যুক্তরাষ্ট্র তাকে কম হুমকি মনে করেন। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংঘাত থেকে এখন বেরিয়ে আসতে চাইছেন স্বয়ং কিমই কারণ তার প্রয়োজন মার্কিন অর্থনৈতিক সহযোগিতা। উত্তর কোরিয়ার সংকট কমাতে কিমের বাস্তবিক চিন্তাভাবনা। আবার যে চীনের ওপরে উত্তর কোরিয়া ভরসা করত সেই চীনও একটি সময়ের পরে উত্তর কোরিয়ার ওপরে চাপ সৃষ্টি করতে তত্পর হয় কিমের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে। উত্তর  কোরিয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞাকেও সমর্থন জানায় চীন। চীনের কাছে বরং কিম আশা করেছিল নিঃশর্ত সমর্থন। দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব ও ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে কিম জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে চীনে গিয়েছিলেন পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এটা ছিল কিমের একটি কূটনৈতিক চাল। ওয়াশিংটন এবং সিউলকে দেখানো যে, চীন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেই আছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বেশ কিছু দেশের ভালো কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। অ্যাঙ্গোলা, আফ্রিকার এই  দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল নিরাপত্তারক্ষীদের মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ দেয় উত্তর কোরিয়া। কঙ্গোর সরকার উত্তর কোরিয়া থেকে স্বয়ংক্রিয় পিস্তল এবং অন্য ছোট অস্ত্র আমদানি করে। উত্তর কোরিয়া মিসরকে ক্ষেপণাস্ত্রের উপকরণ পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ব্যাপারে তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরিত্রিয়া দেশটিরও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। জানা গেছে, তারা উত্তর  কোরিয়া থেকে সামরিক উপকরণ কিনে থাকে।

 

প্রসঙ্গ দক্ষিণ কোরিয়া

বলা হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রক্রিয়ার পেছনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুনের ভূমিকা যথেষ্ট ইতিবাচক। 

উত্তর কোরিয়ার সংকট কমাতে কিমের নতুন চিন্তাভাবনা অবশ্যই বড় ভূমিকা পালন করেছে। আবার কিমের বৈঠকের প্রস্তাব গ্রহণ করে ট্রাম্পও বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। এযাবৎ ট্রাম্পকে যে সব পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে, এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ফলপ্রসূ। আর এর পেছনে দক্ষিণ কোরিয়ার অবদানও প্রশংসার দাবিদার। কিম জং উন সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক করেন।  গত ২৭ এপ্রিল দুই দেশের সীমান্তবর্তী গ্রাম পানমুনজমে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করতে একমত হয় দুই  কোরিয়া। এ ছাড়া ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকে জারি থাকা যুদ্ধবিরতিকে একটি শান্তিচুক্তিতে রূপান্তরিত করার বিষয়েও মতৈক্যে পৌঁছে দুই পক্ষ।

এ বছরের শুরুতে দুই কোরিয়া এক অভূতপূর্ব সমঝোতার প্রদর্শন করে। ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংচ্যাংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী মঞ্চে একই পতাকার নিচে কুচকাওয়াজ করে দুই কোরিয়া। এরপর অতি সম্প্রতি দক্ষিণ এবং উত্তর কোরিয়ার আধিকারিকদের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়। যার শেষ হয় দুই কোরীয় শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বৈঠকের মাধ্যমে। আর এর মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

 

কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব যেভাবে

গত বছর থেকে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক চরম আকার ধারণ করেছিল যা পুরো বিশ্ববাসীকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে উত্তর কোরিয়ার দূরপাল্লার মিসাইল পরীক্ষার পর থেকেই এমন অবস্থার সূচনা হয়। আন্তর্জাতিক মহল কিম জং উনের নেতৃত্বাধীন দেশটিকে বার বার নিষেধ করলেও তারা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় ইস্তফা না দেওয়ায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়। ফলে সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ শাস্তিস্বরূপ উত্তর কোরিয়ার ওপর আবারও ব্যবসায়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। জবাবে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন দ্বীপ গুয়ামে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কথা বলে উত্তর কোরিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তখন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এখন সত্যি সত্যি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুধু গুয়ামে সীমাবদ্ধ রাখবে না সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল প্রায় নিশ্চিত ছিল। এমনকি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে হামলা চালাতেও সক্ষম বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। কিন্তু আসলেই কতটা সক্ষম? কিংবা কতদূর পৌঁছতে পারবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো? এমন নানা প্রশ্নই ঘোরপাক খাচ্ছে সবার মনে। তবে শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক মহলগুলো।

 

বৈঠকের প্রেক্ষাপট

কিছুদিন আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কিম জং উনের নাম দিয়েছিলেন ‘রকেটম্যান’, আর এর জবাবে কিম ট্রাম্পকে বলেছিলেন ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’। দুপক্ষই একে অপরকে এমন হুমকি-ধমকির মধ্যে রেখেছিল যে, পুরো বিশ্বের মধ্যে একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বৈঠকে বসতে যাচ্ছে দুই পক্ষ। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তিনি কিম জং উনকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে রাজি করাতে পারবেন। হঠাৎ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এই লড়াই থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিলেন। তিনি কি শেষমেশ ট্রাম্পের চোখ রাঙানিকে ভয় পেলেন! অনেকেই দাবি করছেন এযাবৎকাল ধরে পিয়ংইয়ংয়ের সব রকম হুমকি আসলে ছিল কাগুজে বাঘের গর্জন!

অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করছেন কিমের এই সিদ্ধান্তের আসল কারণ হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক বিপর্যয়। বিগত দেড় দশক ধরে উত্তর কোরিয়া যতবারই পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে কাজ করেছে ততবারই দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দার সম্মুখীন হয়েছে। কিম এবং তার প্রয়াত পিতা কিম জং-ইলের রাজত্বকালে পিয়ংইয়ং যতই নিজেদের পরমাণু পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে একগুঁয়েমি দেখিয়েছে ততই আন্তর্জাতিক দুনিয়া তার ওপরে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে। একবার দুইবার নয়, বারবার হয়েছে এই নিষেধাজ্ঞার ঘটনা। যার বিরুপ প্রভাব জমতে জমতে এখন উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির রীতিমতো হাঁসফাঁস অবস্থা। 

উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে যারা পরিচিত তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির এমন বেহাল অবস্থা যে, আর এক বছরও কিমের সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পারবে কিনা বলা শক্ত। কিমের এক সাবেক উপদেষ্টা রি জং হো এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন গণমাধ্যমে। পরবর্তীতে অবশ্য তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়। সেই উপদেষ্টা বলেছিলেন, এ সব নিষেধাজ্ঞার ফলে যে অব্যবস্থা তৈরি হবে, তাতে প্রাণও হারাতে পারেন অসংখ্য মানুষ। তিনি আরও বলেন, মুখে ট্রাম্প এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিলেও আদতে উত্তর কোরিয়ার আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা জরুরি, নিজেরই অস্তিত্বের স্বার্থে।

সবাই এখন মনে করছেন এই উপদেষ্টার কথার ভিতরেই কিমের এমন পজেটিভ সিদ্ধান্তের আসল কারণ লুকিয়ে রয়েছে। ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান অবশ্যই কিমকে বাধ্য করেছে নরম হতে, কিন্তু তিনিও বিচক্ষণতা দেখিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বন্ধুত্বের প্রস্তাব বাড়িয়ে দিয়ে। পাশাপাশি চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো রাখার প্রক্রিয়ায় কিম আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শান্তি প্রক্রিয়াকে সফল করতে আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করছেন।

 

কী ঘটতে পারে বৈঠকে?

যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া দুপক্ষই যখন পরস্পরের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধে লিপ্ত হতে যাবে ঠিক তখন হঠাৎই যেন উত্তর কোরিয়ার মাথায় লক্ষ্মী ভর করল। কিম  ঘোষণা করলেন, তার দেশ আর কোনো পরমাণু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথে যাবে না। এক বছরের বেশি সময় উত্তর কোরিয়ায় আটক থাকার পর যুক্তরাষ্ট্রে  ফেরত পাঠানো হয়েছে তিন মার্কিন নাগরিককে। পরমাণু বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণায় বহুদূর এগিয়ে গেছে উত্তর কোরিয়া। তাই মুখে বললেও তারা গোপনে পরমাণু পরীক্ষা চালিয়ে যাবে, বিশ্বের বেশ কয়েকজন গবেষক এমনই মনে করেন। পরমাণু পরীক্ষা ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়ে পিয়ংইয়ং। এরপর বিরোধ মেটাতে উত্তর  কোরিয়ার নেতা কিম জং উন আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে অনেক বিশ্লেষকই বলছেন আলোচনা যাই হোক না কেন, উত্তর কোরিয়া পরমাণু প্রকল্প ত্যাগ করবে না। তবে ওয়াশিংটনের এন্ডরুস বিমান ঘাঁটিতে উত্তর কোরিয়া হতে ফেরত আসা তিন মার্কিন নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান মার্কিন  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। উত্ফুল্ল ট্রাম্প আটক মার্কিনিদের সঙ্গে করমর্দনের পর তাদের মুক্তি দেওয়ায় উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ধন্যবাদ জানান। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা কিম জং উনকে এই চমৎকার কাজের জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। বর্তমানে যে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তার জন্যই আমরা এত দ্রুত এই তিনজনকে বের করে আনতে  পেরেছি।’ আসন্ন বৈঠক সম্পর্কে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, এই মুখোমুখি বৈঠকের ফলে যদি কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করা যায়, তাহলে সেটি হবে তার সবচেয়ে গর্বিত অর্জন। শীর্ষ সেই বৈঠকের আগে তিন মার্কিনকে মুক্তি একটি শুভ সূচনার সৃষ্টি করেছে। বৈঠকের ফলে ‘অর্থপূর্ণ কিছু একটা ঘটবে’। এই দুই দেশের সম্পর্কের এত দ্রুত পরিবর্তনে তাই সবাই বিস্মিত হয়েছেন। এই বৈঠকে ট্রাম্প কী কী আশা করছেন, অথবা উত্তর কোরীয় নেতার সঙ্গে তিনি কী ব্যবহার করবেন সে ব্যাপারে জানতে চাইলে মুখে কুলুপ আঁটেন ট্রাম্প। কোনোভাবেই মুখ খুলতে রাজি নন ট্রাম্প। কোনো সুনির্দিষ্ট রণকৌশল তিনি অনুসরণ করবেন কিনা, সেটিও পরিষ্কার করেননি তিনি। ট্রাম্প বার বার বলেন, আগে থেকে কিছু বলে দেওয়ার পক্ষে তিনি নন। একটি সূত্র থেকে বলা হয়েছে, পুরো ব্যাপারটাকে ধোঁয়াটে রাখতেই ট্রাম্প আগ্রহী।

কারণ এই নাটকীয়তার কারণে টিভি রেটিং বাড়ে। ট্রাম্প বলেছেন, ‘কেউ জানেন না আমি কী করতে যাচ্ছি। সবাই আমার প্রতিটি কথা ভেঙে দেখতে চাইছে আমি কী করব। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, আমি কী করব, সে কথা কেউ জানে না।’


আপনার মন্তব্য