শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:৪৭

সিআইএর দুর্ধর্ষ অভিযান

তানভীর আহমেদ

সিআইএর দুর্ধর্ষ অভিযান

বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) বিশ্বজুড়েই আলোচিত ও সমালোচিত। সিআইএর কার্যক্রম এতটাই গোপন যে, তাদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য কেউই উপস্থাপন করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সারা বিশ্বে তারা গোয়েন্দা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তাদের নজরদারির হাত থেকে কেউই মুক্ত নন। শুধু গোয়েন্দা তথ্য হাতিয়ে নেওয়া নয়- সিআইএ বহু দেশে চালিয়েছে গোপন অভিযান। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও অন্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সিআইএকে নিয়ে যেসব ধারণা পোষণ করে তারই আলোকে আজকের রকমারি-

 

নজরদারি বিশ্বজুড়ে

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৪৭ সালে। তবে এর আগে থেকেই এটি কাজ করে আসছিল বলে মনে করা হয়। অত্যন্ত গোপনীয়তার কারণে কখনো সুনির্দিষ্টভাবে এই গোয়েন্দা সংস্থার অভিযান, কর্মসংখ্যা, বাজেট জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, সিআইএর কর্মী প্রায় ২০ হাজার। এদের মধ্যে রয়েছে স্পেশাল সিক্রেট এজেন্ট। বিভিন্ন স্কোয়াড থাকতে পারে বলেও মত দিয়েছেন তারা। সিআইএ সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তাতে বলা হচ্ছেÑ বিশ্বের প্রতিটি দেশেই সিআইএর এজেন্ট রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে,  সামরিক কর্মকর্তা, মিডিয়াকর্মী সব ধরনের পেশাজীবীই তাদের সোর্স হিসেবে কাজ করে থাকে। বিশ্বব্যাপী তাদের গোপন নেটওয়ার্ক ও সোর্স এজেন্টের কারণেই সিআইএ এতটা শক্তিশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। উইকিলিকস সিআইএর সাম্প্রতিক বছরগুলোর গোয়েন্দা নজরদারির কথা ফাঁস করে চমকে দিয়েছে। তাদের ফাঁস করা নথিগুলো প্রমাণ করে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, স্মার্টটিভি পর্যন্ত তারা হ্যাক করে নিয়েছে। ঘরের ভিতরের কথাবার্তা শুনতে বিশ্বের নামি-দামি ব্র্যান্ডের স্মার্টটিভি হ্যাক করার চেষ্টা চালিয়েছে তারা। এ ছাড়া স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটে আদান-প্রদানকৃত তথ্যও হাতিয়ে নেওয়ার কথা এই নথিগুলোতে রয়েছে। সিআইএর এই গোপন নজরদারির কথা নতুন নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তারা বিভিন্ন উপায়ে মানুষের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছে। রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে তাদের তুলনা নেই। তথ্য সংগ্রহের জন্য তারা যে কোনো উপায় বেছে নিতে সিদ্ধহস্ত। যে কারণে সিআইএকে বিভিন্ন সময় নিষ্ঠুর বলেও সমালোচিত হতে হয়েছে। সিআইএ দেশে দেশে চালিয়ে এসেছে গোপন অভিযান। তারা হিটলিস্ট করে হত্যার চেষ্টা করেছে রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিবিদ। নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড পরিচালনায় তাদের গোপন কিলিং স্কোয়াড যে কারও জন্য আতঙ্কের। বিশ্বের প্রতিটি কোনায় তাদের চোখ রয়েছে। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার সর্বোচ্চ প্রতিশোধও নিয়েছে সিআইএ। হত্যাকাণ্ড ছাড়া গোপন কারাগারে বন্দী নির্যাতনের জন্য তারা সমালোচিত। এ ছাড়া বন্দীদের মুখ থেকে তথ্য আদায়ে নির্মম পন্থা বেছে নিতেও সিআইএ পিছিয়ে নেই। এত সমালোচনার পরও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই গোয়েন্দা সংস্থা বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব রাজনীতিতে বড় একটি ফ্যাক্টর। তার একটি নমুনা বলা যাক-

১৫ বছর আগে পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল সিআইএ। যার কিছু মিলেছে। কিছু ঘটেছে পুরোপুরি ভিন্ন। বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ২০০১ সালে ৯/১১-এ যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার হামলার মধ্য দিয়ে। এর মাত্র এক বছর আগে ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কাছে ২০১৫ সালের পৃথিবী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে একটি প্রতিবেদন জমা দেয় সিআইএ। ওই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে মত দেওয়া হয়। ৭০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে সন্ত্রাসবাদ, মারণাস্ত্র ও বিশ্বের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। এটি সবারই জানা ১৫ বছর আগের পৃথিবীর সঙ্গে বর্তমানের দূরত্ব যোজন যোজন। বিশ্বের ইতিহাস বদলে দেয় ২০০১ সালের ৯/১১। সিআইএর এই সুদূরপ্রসারী ভাবনাই প্রমাণ করে তাদের গোয়েন্দা তথ্য কতটা গুরুত্ব বহন করে।

 

তুখোড় এজেন্ট

হলিউড সিনেমা দেখে গোয়েন্দাগিরির শখ অনেকেরই হয়েছে। সিআইএ এজেন্ট হতে চাইলে কী গুণ থাকা চাই দেখে নিনÑ সিআইএ চাকরি পেতে হলে প্রথমেই লক্ষ্যস্থির গুণ থাকতে হবে। গোয়েন্দার কাজ অনেকটাই বুদ্ধিমত্তায় নির্ভর করে। প্রতি মাসে সিআইএ গোয়েন্দা হতে চেয়ে ১০ হাজারেরও বেশি আবেদন পড়ে। এখান থেকে বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন পরীক্ষায় এগিয়ে থাকা প্রার্থীদেরই কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। গোপনীয় রক্ষার সর্বোচ্চ গুণ রয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা হয়। শিক্ষাজীবনে বিভিন্ন পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফল ও কর্তব্যরত পেশায় অসাধারণ দক্ষতা থাকা চাই। মারাত্মক মানসিক চাপ সামলে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করার দক্ষতা সিআইএ গোয়েন্দার থাকা চাই। এ ছাড়া কম্পিউটর চালনা ও প্রযুক্তিজ্ঞান তাদের নিত্যদিনের কাজে প্রয়োজন হয়। সাঁতার, আকাশ থেকে লাফ, প্রচণ্ড শীতে টিকে থাকা, ম্যারাথন দৌড়ের মতো শারীরিক গড়ন ও সক্ষমতা গোয়েন্দাদের থাকা চাই। সেনাবাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। পৃথিবীব্যাপী অসংখ্য প্রচলিত ভাষায় গভীর জ্ঞান অর্জন করা যে কোনো এজেন্টের নামের পাশে বাড়তি নম্বর যোগ করে।

 

গোপনে গোয়েন্দাগিরি

সিআইএর মতো শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা পৃথিবীতে কমই আছে। সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল জাগেÑ আমেরিকা কীভাবে সারা বিশ্বে গোয়েন্দা বৃত্তি চালায়? উত্তরটা খুব কঠিন নয়। তবে অনেকেই জেনে অবাক হবেন, গুপ্তচররাই তাদের আসল সোর্স হিসেবে কাজ করছে। প্রায় প্রতিটি দেশে তাদের সরাসরি এজেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া তাদের হাতে রয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, স্মার্টটিভি, টেলিফোন, ই-মেইল- এসব প্রযুক্তিতে তথ্য আদান-প্রদানের সময় নজরদারি চালিয়ে থাকে।

উইকিলিকসের ফাঁস করা নথিতে সিআইএর এ ধরনের নজরদারির কথা বিশ্ববাসী ইতিমধ্যে জেনেছে। তা ছাড়া তথ্য আউটসোর্সিংয়ে বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যয় করে তারা। নিজ দেশের লোকই টাকার লোভে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাদের কাছে বিক্রি করে থাকে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও নীতি-নির্ধারক লোকদের অর্থবিত্তের মাধ্যমে কিনে নেয়। সিআইএ তথ্য সংগ্রহের জন্য অর্থের বিনিময়ে এনজিওগুলোকেও বিভিন্ন দেশে ভালোভাবেই ব্যবহার করেছে। নানামুখী সেবা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির আড়ালে তারা সূচারুভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে বিশ্বজুড়ে। বলা হয়, সিআইএর অন্যতম প্রধান গোয়েন্দা তথ্য প্রাপ্তির মাধ্যম হচ্ছে মিডিয়াগুলো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল, সরকারি প্রকাশনা, পরিসংখ্যান, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে তারা তথ্য সংগ্রহ করে। নানাভাবে বিশ্বজুড়ে ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে কাজে লাগায় তারা। বড় বড় সেনা কর্মকর্তাকে অস্ত্র ব্যবসার ফাঁদে ফেলে তাকে কাজে লাগিয়ে তথ্য উদ্ধার করার কথাও বলেছেন অনেকে। আর সমমনা রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়েও তারা গোপন তথ্য হাতিয়ে নেয়।

 

চেয়েছিল মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করতে

মানুষের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটি পরিকল্পনা নিয়ে সিআইএ কাজ করেছিল। সম্ভাবনার হার যতই হোক, সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য সিআইএ বসে থাকেনি কোনোকালেই। বিশ্বসেরা এই গোয়েন্দা সংস্থা মানুষের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিতে এলএসডির মতো উত্তেজক ড্রাগস ব্যবহার করে। গবেষণায় বেরিয়ে আসে, এলএসডির মতো উত্তেজক ড্রাগস দিয়ে ইচ্ছা করলেই মানুষের মাথার নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে নেওয়া সম্ভব। এমনকি সেক্সচ্যুয়াল ব্ল্যাকমেইলিং করার জন্য সিআইএর গবেষণাগারে সফলতা পেতে গোয়েন্দা কাজে এলএসডি ড্রাগস হয়ে ওঠে সংস্থাটির তুরুপের তাস। যে এলএসডি ড্রাগসটি নিয়ে সিআইএ কাজ করছিল সেটা এমনিতেই যথেষ্ট উত্তেজক ড্রাগস ছিল। সেটার প্রভাব পরবর্তীতে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সেটা বিবেচনা না করেই সিআইএ তার গবেষণা চালিয়ে যায়। অনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতেই মানুষের মস্তিষ্ক কব্জা করে নিতে এলএসডির ব্যবহার নিয়ে হঠাৎ একজন সিআইএ ইন্সপেক্টর নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে অপারেশন মিডনাইটের মতোই এলএসডি ড্রাগস দিয়ে মানুষের মাথার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটা গবেষণা হয়েছিল এবং তার ফলাফল খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। সিআইএ জেনারেল আবারও গবেষণা চালিয়ে যেতে বললে শিগগিরই এলএসডি উত্তেজক ড্রাগস দিয়ে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের একটি ত্র“টি ধরা পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে এলএসডি দিয়ে মোহগ্রস্ত সাবজেক্ট শত্র“পক্ষকে হামলার পরিবর্তে উল্টো প্রশিক্ষণ কর্মীদের হামলা করে বসে। মাথার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়ে সিআইএ অপারেশন মিডনাইট বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এই প্রজেক্ট থেকে যায় দুনিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাদের ভাবনার খোরাক হিসেবে।

 

কাস্ত্রোকে হত্যার নীল নকশা করেছিল

 শুধু সিআইএ নয়, বরং সারা দুনিয়ার ইতিহাসের সেরা গোয়েন্দা হামলার একটি এই অপারেশন জ্যাপাট। অপারেশন জ্যাপাট যে শুধু সিআইএর জন্য একটি দুর্ধর্ষ অভিযান ছিল তা নয়, গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে সিআইএ কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে সেটার একটি চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়ায়। ১৯৬১ সালে কিউবায় প্রায় এক হাজার ৫০০ অত্যন্ত দক্ষ সিআইএ সেনা এই অপারেশনে অংশ নিয়েছিল। পিগস ইনভেশন নামটি দেওয়া হয় গোয়েন্দা হামলার মারাত্মক ব্যর্থতার জন্য। এই অপারেশনে সংগঠনটির কয়েক হাজার সেনা কিউবার সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং তাদের নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করা হয়। ফিদেল কাস্ত্রোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সিআইএ এই গোয়েন্দা হামলার নীলনকশা করেছিল। বাইরে থেকে পরিকল্পনার সব ঠিক দেখালেও কিউবায় হামলা করতে নেমে পরিস্থিতি একেবারেই সিআইএর প্রতিকূলে চলে যায়। একে তো কাস্ত্রোর ব্রিগেড সিআইএর হামলা সম্পর্কে আগেই জেনে ফেলেছিল এবং কাস্ত্রোর সেনা ব্রিগেডের বিছানো ফাঁদেই সিআইএ পা ফেলেছিল। সব মিলিয়ে সিআইএর অপারেশন জ্যাপাট ছিল একটা লম্বা দুঃস্বপ্ন। বোদ্ধারা বলেন, সেই অপারেশনের ক্ষয়ক্ষতি আজও পুষিয়ে উঠতে পারেনি তারা। এক হাজার ৫০০ জনের সিআইএর প্রশিক্ষিত বাহিনী কিউবার উপকূলে নামমাত্র হামলা করতে পেরেছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিউবার সেনা ব্রিগেড তাদের ঘিরে ধরে এবং আটকে ফেলে। তথ্যগত কোনো ত্র“টি যতটা না ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল প্রতিপক্ষের সামর্থ্য মোকাবিলায় নিজেদের দুর্বলতা। তবে সিআইএ ছেড়ে কথা বলেনি। কিউবা সীমান্তে প্রতিরোধ গড়ে তোলে কিউবা ব্রিগেড। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর সিআইএ বাহিনী ধরা পড়ে গেলে পুরো যুদ্ধের ময়দানে আলোচিত হয় সিআইএর সামর্থ্য নিয়ে।

 

কুখ্যাত স্টারগেট প্রজেক্ট

ভবিষ্যৎকে বিশ্লেষণ করার অনন্য ক্ষমতা নিয়ে শুরু হয়েছিল দ্য স্টারগেট প্রজেক্ট। এক কথায় বলতে গেলে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণের জন্যই এ প্রজেক্ট শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার সিআইএকে দিয়ে করানো সবচেয়ে বড় আকারের প্রজেক্ট হিসেবে কুখ্যাতি পেয়েছিল এই স্টারগেট। মেধাবী সাইকিক তথা মনোবিজ্ঞানীদের হাত করেছিল সিআইএ। তাদের সংখ্যা ঠিক কত ছিল গোপনীয়তা ভেঙে সেটা আজও কেউ বের করতে পারেনি। তবে তাদের পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঢালা হয়েছিল। বিজ্ঞান স্বীকৃতি দেয়, অসাধারণ মেধাবীদের যে কোনো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অন্য সাধারণের চেয়ে শতকরা ১৫ ভাগ বেশি সঠিক তথ্য বা ভবিষ্যৎ ফলাফল বলে দিতে পারে। আর সাইকিক দিয়ে ঠিক এটাই বের করে আনতে চেয়েছিল সিআইএ। তারপর মাস্টার প্ল্যানটা খুব সহজ। একটি হামলার পর প্রতিপক্ষ ঠিক কী জবাব দেবে সেটা আগেই জেনে ফেলা। ব্যস, তারপর তো পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে। গোপন নথিপত্র ঘেঁটে শত্র“দের পরিকল্পনা জেনে ফেলার চেয়েও এটা জেনে ফেলা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা নিশ্চয়ই অনুমেয়। তবে সিআইএ দ্য স্টারগেট প্রজেক্টে হয়তোবা সফলতা পায়নি বলেই অনেকের ধারণা। অসংখ্য সাইকিকের গোপনীয়তা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রজেক্টটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য এখনো অনেকে বিশ্বাস করে, সিআইএ প্রজেক্টটি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

 

ভিয়েতনামে অপারেশন ফোনিক্স

প্রেসিডেন্ট কেনেডি নিহত হওয়ার পর ভিয়েতনামে মার্কিন অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। তখন এই একটি হত্যা আরও হাজার হাজার মানুষ হত্যার উপলক্ষ হয়ে সামনে চলে আসে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর বদলা নিতে সিআইএ তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে উঠেপড়ে লেগে যায়। আর সেই লক্ষ্যে ১৯৬৪ সালে সিআইএর পরিকল্পনায় টংকিং উপসাগরের তীরবর্তী এলাকায় উত্তর ভিয়েতনামি সৈন্য সেজে অবস্থান নেয় মার্কিন বাহিনী। আর ভাড়াটে মার্কিন সেনাদের হামলায় ১০ হাজার দক্ষিণ ভিয়েতনামি নিহত হন।

এর পেছনে ছিল আরেক রহস্য। এ হামলার দোহাই দিয়ে আমেরিকা উত্তর ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। একই সঙ্গে পূর্ণতা পায় অপারেশন ফোনিক্স। ১৯৬৭ থেকে ৭২ সালের মধ্যে সিআইএ খুন করে ৩০ হাজারের বেশি উত্তর ভিয়েতনামি রাজনীতিবিদ। এটি ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও জঘন্য গণহত্যা হিসেবে কুখ্যাত। সিআইএ এত বড় আকারে কোনো অভিযান কমই করেছে। আর তাদের পরিচালিত যে কোনো অভিযানে এত মানুষ হত্যা করার নজিরও নেই।

 

সিআইএর মাস্টারপ্ল্যান

১৯৬০ সালে সিআইএর সামনে একটি চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়- কিউবার ভিত্তি বলে পরিচিত ফিদেল কাস্ত্রোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হবে। সিআইএ সবচেয়ে সহজ পথটি খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। শেষে সিআইএ যে পরিকল্পনা কষে সেটা শুনে আঁতকে ওঠে অনেকেই। কিন্তু পুরো মাস্টার প্ল্যান নিয়ে সিআইএ গোছগাছ শুরু করে। পরিকল্পনাটা ছিল আমেরিকানদের দিয়ে ইউএসের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হবে। হত্যা পরিকল্পনার মূলে থাকবে আমেরিকায় সন্ত্রাস আর খুনের একটা মারাত্মক ছকে বিস্তার করা এবং এই অস্থিরতার দায়ভার দেওয়া হবে কিউবার শক্তিমান ফিদের কাস্ত্রোর ওপর। সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগ তুলে বিশ্বের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে কিউবায় সামরিক হামলা এবং ফিদেল কাস্ত্রোর পতন নিশ্চিত করা। এ ভয়াবহ মাস্টার প্ল্যান শুধু জন এফ কেনেডির সম্মতির অভাবে বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সিআইএর এই মাস্টার প্ল্যান গোপন থলে থেকে বেরিয়ে আসে। বোদ্ধারা বলেন, অপারেশন নর্থউডস বাস্তবায়ন না হলেও এই মাস্টার প্ল্যান এখনো নানা দেশে নানাভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

অপারেশন গোল্ড

 রাশিয়া যখন বার্লিনে তাদের যুদ্ধকৌশল বিস্তারের জন্য ফোনকলনির্ভর হয়ে পড়ে তখনই তথ্যচুরির জন্য সিআইএ ফোনকলে আড়িপাতার ধারণাটির জš§ দেয়। শুরু হয় বিশাল আকারের ফোনকল চুরির ঘটনা। সিআইএ খুব গোপনে এই মাস্টার প্ল্যানটি দাঁড় করায়। অপারেশন গোল্ড নামটা শুনে অনেকেরই মনে হতে পারে স্বর্ণ উদ্ধার বা স্বর্ণ নিয়ে কিছু একটা হবে। আসলে এই অভিযানে স্বর্ণ নিয়ে কোনো হানাহানি নয়, তবে সিআইএর স্বর্ণোজ্জ্বল একটি অভিযান ছিল এই অপারেশন গোল্ড। ব্রিটিশ সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস ১৯৫৩ সালে রাশিয়ার সঙ্গে স্নায়ু যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সে সময় ইন্টেলিজেন্স টিম এম-১৬ নিয়ে কাজ করে। শুরুতেই রাশিয়ার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ফোনকলে আড়িপাতে। ফোনকলে আড়িপাতার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সিআইএ দুর্ধর্ষ একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে। রাশিয়ার সামরিক শক্তির নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা পূর্ব বার্লিনে সিআইএ ঢুকে পড়ে। পূর্ব বার্লিনে সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়কের নিচ দিয়ে চলে গেছে টেলিফোনের তার। রাস্তার নিচে প্রায় ১,৪৬৭ ফুট লম্বা টানেল ধরে এগিয়ে যায় ইন্টেলিজেন্স টিম এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংযুক্ত করে টেলিফোনের তারে। ১৯৫৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে পুরো কাজটি শেষ হতে তারা সময় নেয় ১৯৫৫ সালে ২৫ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত।

 

অ্যাকুয়েস্টিক কিটি

সিআইএর উদ্ভাবনী দক্ষতা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। একেবারেই সন্দেহের বাইরে, ধারণার বাইরে যতভাবে সম্ভব গোয়েন্দা কাজ চালানোর বিষয়গুলোতে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে গবেষণা চালায়। ফলাফল হিসেবে নিয়ে আসে কাজের সফলতা। বিড়াল পাঠিয়ে রুশ দূতাবাসের ভিতরকার খবর হাতিয়ে নেওয়ার একটি অপারেশন চালিয়েছিল সিআইএ। ২০ মিলিয়ন ডলারের এই অপারেশনে পাঠানো বিড়ালটিকে কিটি বলে ডাকা হতো। যদিও বেশ কয়েকটি বিড়ালকেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। বিড়ালগুলোর দেহে কৌশলে মাইক্রোফোন, অ্যান্টেনা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিড়ালের কানে, নাকে, লেজে ছিল যোগাযোগের আধুনিক সব প্রযুক্তি। খুবই হতাশার বিষয়, সিআইএর সবচেয়ে দক্ষ বিড়ালটি দূতাবাসে  ঢোকবার আগেই গাড়িচাপা পড়ে প্রাণ হারায়। রুশীয়রা বিড়ালটিকে পরীক্ষা করে সিআইএর ‘অ্যাকুয়েস্টিক কিটি’ সম্পর্কে জেনে যায়। ব্যর্থ হয়ে যায় অপারেশন অ্যাকুয়েস্টিক কিটি।

 

 

এক নজরে

প্রতিষ্ঠাকাল : ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭।

[ অনির্ধারিত কাজ ১৯৪৭-এর আগে থেকেই ]

সংস্থার ধরন : স্বাধীন গোয়েন্দা সংস্থা।

পূর্বসূরি : অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস [ওএসএস]

উত্তরসূরি সংস্থা : সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স গ্র“প।

সদর দফতর : জর্জ বুশ সেন্ট্রাল ফর ইন্টেলিজেন্স, ভার্জিনিয়া।

কর্মী সংখ্যা : গোপনীয়।

আনুমানিক : ২০ হাজার

বার্ষিক বাজেট : ৪৫ বিলিয়ন ডলার, ঘোষিত।

জবাবদিহিতা : কংগ্রেসনাল অ্যাফেয়ার্স অফিস,

হোয়াইট হাউস, মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে সিআইএ সব ধরনের তথ্য সরবরাহ করে।

 

যেভাবে তথ্য সংগ্রহ

► সরাসরি নিজস্ব গোয়েন্দা বা এজেন্টের মাধ্যমে।

► সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।

► গোয়েন্দা তথ্য আউটসোর্সিং করা।

► এনজিও বা বেসরকারি সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করা।

► সিআইএর তথ্য সংগ্রহের বড় একটি মাধ্যম হচ্ছে মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল, সরকারি প্রকাশনা, পরিসংখ্যান, সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে তারা তথ্য সংগ্রহ করে।

► নানাভাবে বিশ্বজুড়ে তহবিল জোগানোর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে কাজে লাগানো।

► বড় বড় সেনা কর্মকর্তাকে অস্ত্র ব্যবসার ফাঁদে ফেলে তাকে কাজে লাগিয়ে তথ্য উদ্ধার।

► রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারক লোকদের অর্থবিত্তের মাধ্যমে কিনে নেওয়া।


আপনার মন্তব্য