শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৩৩

বারবার সেনাশাসন মিয়ানমারে

সাইফ ইমন

বারবার সেনাশাসন  মিয়ানমারে

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৭২ বছরের জীবনে মিয়ানমারকে বেসামরিক সরকার শাসন করেছে মাত্র ১৫ বছর। এর মধ্যে গত ১০ বছর শাসন করেছেন বেসামরিক শাসনের ছায়াতলে সামরিক শাসক। সুতরাং মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান নতুন কিছু নয়। এরপরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে উত্তাল মিয়ানমারে নতুন  করে সামরিক শাসন বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। মিয়ানমারের নতুন সামরিক শাসন ও ইতিহাসের আয়নায় দেশটির বারবারের  সেনাশাসন নিয়েই এ আয়োজন।

 

হঠাৎ পুরনো চেহারা নতুন মিয়ানমারের

২০১৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির বিজয়ের পর গণতান্ত্রিক মিয়ানমারকে সবাই বলছিল নতুন মিয়ানমার। এরপর রোহিঙ্গা নির্যাতনসহ নানা ইস্যুতে সারা বিশ্বের কাছে সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে মিয়ানমারকে। তবু কথিত গণতন্ত্র ছিল। কিন্তু সামরিক জান্তার হস্তক্ষেপ এ দেশের গোটা ইতিহাসে। আর সেই রূপটাই সত্য হয়ে ধরা দিল বর্তমানে। আবারও মিয়ানমারের ক্ষমতা হাতে তুলে নিল সামরিক বাহিনী। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মিয়ানমারে কয়েক দিন ধরে বেসামরিক সরকার ও প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর দ্বন্দ্ব এবং উত্তেজনার মধ্যে ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে জরুরি অবস্থা। মিয়ানমারে সামরিক শাসনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। গত শতকের অর্ধেক সময়ই সেনাশাসনের নিয়ন্ত্রণে ছিল দেশটি। সে সময় দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দী করে রাখা হয় সু চিকে। গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অহিংস লড়াইয়ের জন্য ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। এরপর তাঁর দল এনএলডি জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসে। ২০১০ সালে মুক্তি পান সু চি। ২০১১ সালে শুরু হয় গণতান্ত্রিক সংস্কার। ২০১২ সালের উপনির্বাচনে ৪৫ আসনের মধ্যে ৪৩টিতে জয়ী হয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয় সু চির এনএলডি। এরপর ২০১৫ সালের নির্বাচনে এনএলডি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। সে সরকারের মেয়াদ শেষে গত বছরের ৮ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনে এনএলডি বড় জয় পায়। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যেখানে ৩২২ আসনই যথেষ্ট, সেখানে এনএলডি পায় ৩৪৬ আসন। কিন্তু সেনাবাহিনী সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ভোটে প্রতারণার অভিযোগ তুলে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলে। নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করলে দেশব্যাপী উত্তেজনা তৈরি হয়। এর ফলেই মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করল। প্রথম দিনেই ক্ষমতাচ্যুত অং সান সু চির সরকারের অধিকাংশ সদস্যকে বরখাস্ত করে নতুন লোক নিয়োগ করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বিবিসি বার্মিজ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, সু চি সরকারের ২৪ জন মন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে নতুন ১১ জন মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রীদের অধিকাংশই সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা। কয়েকজন রয়েছেন সেনা সমর্থিত দল ইউএসডিপির সদস্য। ইউএসডিপির অন্যতম নেতা উনা মং লউনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। জানা গেছে, তিনি নভেম্বরের নির্বাচনে  হেরে গিয়েছিলেন। সেনাবাহিনী পরিচালিত  টেলিভিশনে নতুন এসব নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সব চাপ উপেক্ষা করে এ ধরনের সেনা কর্মকান্ড অব্যাহত রয়েছে দেশটিতে। আমেরিকার সরাসরি হুঁশিয়ারিতেও কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া এখনো আসেনি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে। মিয়ানমারের ক্ষমতা এখন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাবাহিনীর সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের হাতে। নভেম্বরের  ভোটে জিতেছিল সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর  ডেমোক্র্যাসি। অভিযোগ, সেই ভোটে কারচুপি হয়েছে। এ নিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকার এবং  সেনার মধ্যে বিবাদ ক্রমেই বাড়ছিল।

 

মিয়ানমার ১৯৪৮-২০২১

৪ জানুয়ারি, ১৯৪৮ : বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) নামে পরিচিত দেশটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

 

১৯৬২ : অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন সামরিক নেতা নে উইন ও সামরিক জান্তার মাধ্যমে বহু বছর ধরে দেশটি শাসন করেন।

 

১৯৮৮ : স্বাধীনতা নায়কের কন্যা অং সান সু চি নিজ দেশে ফিরে আসেন। গণতন্ত্রের দাবিতে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়। আগস্টের প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে শতাধিক মানুষ নিহত হন।

 

জুলাই, ১৯৮৯ : জান্তার ক্রমবর্ধমান স্পষ্টবাদী সমালোচক হিসেবে পরিচিত পাওয়া সু চিকে গৃহবন্দী করা হয়।

 

২৭ মে, ১৯৯০ : দেশটির জাতীয় নির্বাচনে সু চি প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) দুর্দান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনলেও সামরিক বাহিনী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়।

 

অক্টোবর, ১৯৯১ : শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ সংগ্রামের জন্য সু চিকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

 

৭ নভেম্বর, ২০১০ : গণতান্ত্রিক মিয়ানমারের প্রথম নির্বাচনে ২০ বছরের মধ্যে জান্তাপন্থি একটি দল জয়লাভ করে। তবে ভোট কারচুপি ও পক্ষপাতের দাবি করে ওই ভোট গ্রহণ বর্জন করা হয়েছিল।

 

১৩ নভেম্বর, ২০১০ : দুই দশকের বেশি সময় ধরে গৃহবন্দী থাকার পর সু চি মুক্তি পান।

 

২০১২ : উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদে আসন গ্রহণ করেন সু চি।

 

৮ নভেম্বর, ২০১৫ : ১৯৯০ সালের পর প্রথম প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে এনএলডি দুর্দান্ত বিজয় পায়। সংবিধানের অধীনে সেনারা ক্ষমতা ধরে রাখতে সু চিকে প্রেসিডেন্ট হতে দেননি, তবে সরকারের নেতৃত্ব দিতে তার জন্য স্টেট কাউন্সিলর পদ তৈরি করা হয়।

 

২৫ আগস্ট, ২০১৭ : বিদ্রোহীরা পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে সামরিক ফাঁড়িতে হামলা চালায়। এতে সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু সদস্যকে হত্যা করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এরপর কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

 

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ : সু চি হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে এক মামলায় সামরিক বাহিনীকে রক্ষা করার জন্য রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো ‘গণহত্যা’র কথা অস্বীকার করেন।

 

৮ নভেম্বর, ২০২০ : মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে এনএলডি সংসদে সম্পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়।

 

২৯ জানুয়ারি, ২০২১ : নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে বলে সামরিক বাহিনীর করা অভিযোগ সমর্থন করার মতো কোনো প্রমাণ খুঁজে না পাওয়ায় তা খারিজ করে দেয় নির্বাচন কমিশন।

 

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ : সরকার ভোট জালিয়াতির অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ও করোনাভাইরাস সংকটেও নভেম্বরের নির্বাচন স্থগিত করতে অস্বীকার করায় এক বছরের জন্য দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এনএলডি বলছে, সু চিকে আবার গৃহবন্দী করা হয়েছে।

 

সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের উত্থান

ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ পর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) দলের নেতাদের গ্রেফতার করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে এখন আলোচনায় মিন অং হ্লাইং। অবসরের মাত্র কয়েক মাস আগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করলেন তিনি। সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং ইয়াঙ্গুন ইউনিভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর একজন সহপাঠী ২০১৬ সালে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, মিন অং হ্লাইং খুব কম কথার মানুষ। তিনি প্রধান সামরিক বিশ্ববিদ্যালয় ডিফেন্স সার্ভিসেস একাডেমিতে (ডিএসএ) আবেদন করেন। ১৯৭৪ সালে তৃতীয় দফায় তিনি সফল হন। ডিএসএতে তাঁর এক সহপাঠীর মতে, তিনি ছিলেন একজন গড়পড়তার ক্যাডেট। সেনা থেকে রাজনীতিক, গণতান্ত্রিক পালাবদল যখন শুরু হয় ২০১১ সালে তখন সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন মিন অং হ্লাইং। সু চির প্রথম দফার মেয়াদে মিন অং হ্লাইং নিজেকে একজন স্পষ্টভাষী সেনা থেকে একজন রাজনীতিক হিসেবে পাল্টে ফেলেন। তখন থেকেই তিনি নানা রকম সরকারি কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িত করেন এবং তিনি ফেসবুকে প্রচার করতে থাকেন। এসবই নজরে পড়েছে তাদের। ২০১৭ সালে তাঁর সেনাবাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস নারকীয়তা সংঘটিত করে। এর আগ পর্যন্ত তাঁর সরকারি প্রোফাইলে হাজার হাজার মানুষ ছিলেন ফলোয়ার। কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, ২০১৬ সালে আরও ৫ বছরের জন্য নিজের ক্ষমতার মেয়াদ বৃদ্ধি করিয়ে নেন সেনাপ্রধান। সেনাবাহিনীর নিয়মিত রদবদলের অংশ হিসেবে সে সময় তাঁর পদত্যাগ করার কথা। পদত্যাগ না করে মেয়াদ বাড়ানোয় বিস্মিত হন পর্যবেক্ষকরা।

 

আলোচিত সমালোচিত সু চি

মিয়ানমারের স্বাধীনতার নায়ক জেনারেল অং সানের মেয়ে অং সান সু চি। সু চির যখন দুই বছর বয়স তখন তাঁর বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র দুই বছর পর এই হত্যাকান্ড ঘটেছিল। মিস সু চি গোটা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তাঁকে একসময় মানবাধিকারের বাতিঘর বলা হতো। যিনি একজন নীতিবান অধিকারকর্মী হিসেবে দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারের শাসন ক্ষমতায় থাকা নির্দয় সামরিক জেনারেলদের চ্যালেঞ্জ করতে নিজের স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। শান্তিতে অবদানের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়েছিলেন সু চি। তবে রোহিঙ্গা প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে তাঁর প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। জাতিগত নিধনের দোষাারোপ করা হয় তাঁর ওপর। ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অন্তত ১৫ বছর বন্দীজীবন কাটিয়েছেন সু চি। দেশটিতে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেয়েছিলেন।

 

প্রথম সাধারণ নির্বাচন ও সু চির ফিরে আসা

সুদীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতি ঘটিয়ে ২০১৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে মিয়ানমার।   ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি এবং ইউনিয়ন সংহতি ও উন্নয়ন পার্টিই মিয়ানমারের প্রধান রাজনৈতিক দল।  এর আগে ২০১০ সালে নির্বাচন হলেও বিভিন্ন বিদেশি পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নির্বাচনের একটি সমালোচনা ছিল যে কেবল সরকার অনুমোদিত রাজনৈতিক দলগুলোকে এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৬ সালের নির্বাচন জাতীয় লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির নেতা অং সান সু চির গৃহবন্দীকরণের অবসান ঘটিয়েছে এবং দেশজুড়ে অবাধে চলাফেরা করার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়।    মিয়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস বিরোধী দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামের দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসন থেকে একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাত্রা শুরু করলেও আবারও একই জায়গায় ফিরে গেল দেশটি বর্তমান পরিস্থিতিতে। যা বিশ্বনেতারা মোটেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন না। এই রাজনৈতিক রূপান্তর দেশটির চলমান ঘটনা হয়ে গেছে।

 

২৬ বছরের সেনাশাসন নে উইনের

দীর্ঘ ২৬ বছর মিয়ানমার শাসন করেছেন নে উইন। তিনি ছিলেন সামরিক কমান্ডার। দুই মেয়াদে বার্মার প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বার্মা সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন ও দলের সভাপতি ছিলেন। ১৯৬২ সালের ২ মার্চ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। পরবর্তীকালে বার্মার রাষ্ট্রপ্রধানসহ প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। নে উইন ঘোষণা করেন যে, সংসদীয় গণতন্ত্র বার্মার জন্য উপযুক্ত নয়। নতুন সরকার সাংবিধানিক কার্যক্রম স্থগিত করে ও আইনসভা ভেঙে দেয়। ১৯৬২ সালে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঙ্গা শুরুর পরিপ্রেক্ষিতে সেনা মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। প্রতিবাদকারীদের প্রতি নির্বিচারে গোলাবর্ষিত হয় ও ছাত্র সংগঠনের ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পাঁচ মিনিটের বেতার ভাষণে নে উইন বলেন, ‘যদি প্রতিবাদকারীরা আমাদেরকে মুখোমুখি হতে বলে, তাহলে আমরা তরবারির বিপরীতে তরবারি দিয়ে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।’ এভাবেই সারা দেশে দীর্ঘ সময়ের শাসন জারি করেন নে উইন। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত দুই বছরেরও অধিক সময় দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছিল। ক্ষমতায় আরোহণের পর বেশ কিছু পুনর্গঠনে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৪ সালে বার্মা সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি (বিএসপিপি) প্রতিষ্ঠা করেন ও দেশের একমাত্র বৈধ দল হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। ১৯৮১ সালে নে উইন পদত্যাগ করেন ও তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জেনারেল সান উ। কিন্তু নে উইন দলীয় প্রধান হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করেন ও  ১৯৮৮ সালের ২৩ জুলাই দল থেকে বের হয়ে যান।

 

থমথমে মিয়ানমার উদ্বিগ্ন বিশ্ব

মিয়ানমারের সামরিক টেলিভিশনে গত সোমবার সকালে  ঘোষণা করে যে, সেনাবাহিনী দেশের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। তারা এক বছরের জন্য মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। গত বছরের নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে জালিয়াতির জন্য তারা বেসামরিক সরকারের জ্যেষ্ঠ  নেতাদের গ্রেফতার করেছে। এরপর থেকেই দেশটিতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়েই একদল স্বঘোষিত ‘জাতীয়তাবাদী অ্যাক্টিভিস্ট’-এর উত্থান দেখা গেছে বিভিন্ন শহরে। তাদের আবার উল্লাস করতেও দেখা গেছে বলে জানান বার্তা সংস্থা বিবিসির স্থানীয় প্রতিনিধি। তাদেরই একজন বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা শহরজুড়ে আনন্দ মিছিল করবেন। আবার এদিকে গত কয়েক দিন ধরে কয়েকটি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীকে ইয়াঙ্গুনে সেনাবাহিনীর সমর্থনে কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে।

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন দেশটির গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সু চি। সোমবার দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানায়, সু চি ও তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) জ্যেষ্ঠ নেতাদের  দেশটির সেনাবাহিনী গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টার মাথায় জনবিক্ষোভের ডাক দেন এনএলডির এই নেত্রী। তাঁর নামে প্রচারিত এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের জনগণকে বিক্ষোভ  দেখানোর আহ্বান জানানো হয়। তবে মিয়ানমারে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানা গেছে এবং এখনো অভ্যুত্থানের বিপক্ষে কোনো প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ দেখা যায়নি। রাজধানী নেপিদোতে সরকার নিয়ন্ত্রিত টেলিফোন নেটওয়ার্কের শুধু টেলিফোন সেবা ফিরে এসেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এদিকে রাজনৈতিক নেতাদের আটকের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসসহ বিশ্বের অনেক নেতৃবৃন্দ। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টাফেন দুজারিক এক বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব মিয়ানমারের নির্বাহী এবং বিচারিক ক্ষমতা সামরিক বাহিনীতে স্থানান্তরের ঘোষণার বিষয়ে তাঁর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব ঘটনা মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সংস্কারে মারাত্মক আঘাত বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বনেতারা।

 


আপনার মন্তব্য