দেড় বছর ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে স্বাধীনতা ভাস্কর্যের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা। চারদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। ভাস্কর্যের শরীরে পাখিদের বিষ্ঠা। রাজধানীর অধিকাংশ ভাস্কর্যের একই চিত্র। পথশিশুদের কাঁথাকাপড় রোদে শুকানো হচ্ছে ঐতিহাসিক রাজু ভাস্কর্য প্রাঙ্গণে। বনানী-কাকলী মোড়ের অদম্য বিজয় কিংবা কুড়িল বিশ্বরোডের নিকুঞ্জ স্বাধীনতা-সব কটিই বেহাল। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর ফুলার রোডে অবস্থিত স্বাধীনতার ভাস্কর্য একসময় যেখানে মুক্তির চেতনা যেন জীবন্ত হয়ে উঠত আজ সেখানে নীরবতা, ধ্বংসাবশেষ আর বিষণ্নতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই-রাব্বানী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিত্বদের আবক্ষ অবয়ব সজ্জিত ছিল। সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মুখাবয়ব এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে মেনে নেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন জেনেছি। এখানে দাঁড়ালে মনে হয় শুধু একটি ভাস্কর্য নয় আঘাত করা হয়েছে জাতির স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের ওপর। ইতিহাসের জীবন্ত দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেসব ভাস্কর্য এখানে সেই স্মৃতি যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্রী শ্রী তমাশ্রী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত এই স্থাপনাটির ভাঙা অংশ এখনো পড়ে আছে ছড়িয়েছিটিয়ে যেন ইতিহাসেরই ভাঙা টুকরো ছড়িয়ে আছে চারপাশে।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ঐতিহ্যবাহী এই ভাস্কর্যগুলো সংস্কারে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভগ্নদশায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই এবং এ কে ফজলুল হকের মতো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ভাস্কর্যগুলো দীর্ঘদিন ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সংস্কারের অভাব প্রকট। দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্মারক হিসেবে পরিচিত এই ভাস্কর্যগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বা দ্রুত সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ভাস্কর্যগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। প্রখ্যাত ভাস্কর শামীম সিকদার ১৯৯৮-৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সড়কদ্বীপে মোট ১১৬টিরও বেশি ভাস্কর্য স্থাপন করে সংগ্রহশালাটি গড়ে তুলেছিলেন। এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এক সুতোয় বাঁধার একটি অনন্য স্মারক।